
অঙ্কন বা ছবি আঁকা মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। ভাষা বা লিপির জন্মের হাজার হাজার বছর আগে মানুষ ছবি আঁকার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল। অঙ্কনের আবিষ্কার কোনো নির্দিষ্ট দিনে বা কোনো একজন ব্যক্তির হাত ধরে হয়নি; বরং এটি ছিল বেঁচে থাকার তাগিদ এবং মনের ভাব প্রকাশের একটি প্রাকৃতিক বিবর্তন। প্রাগৈতিহাসিক যুগে, যখন মানুষের কাছে কোনো ভাষা ছিল না, তখন তারা ইশারা এবং ছবির মাধ্যমেই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করত। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৪৫,০০০ বছর আগে মানুষ প্রথম গুহার দেওয়ালে ছবি আঁকতে শুরু করে। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপ বা ফ্রান্সের লাস্কো গুহায় যে চিত্রকর্মগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো মানুষের আদিমতম সৃজনশীলতার প্রমাণ। এই ছবিগুলো আঁকা হতো কাঠকয়লা, পশুর চর্বি এবং বিভিন্ন খনিজ মাটির রঞ্জক দিয়ে। আদিম মানুষের জন্য এই অঙ্কন কেবল বিনোদন ছিল না। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শিকারের আগে ধর্মীয় আচার হিসেবে বা শিকারের কৌশল শেখাতে এই ছবিগুলো ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ, অঙ্কন ছিল তৎকালীন মানুষের জন্য একটি টিকে থাকার হাতিয়ার এবং ইতিহাসের প্রথম তথ্যাগার।
প্রাচীন সভ্যতা ও অঙ্কনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
সভ্যতা যত উন্নত হয়েছে, অঙ্কন তত বেশি সুশৃঙ্খল এবং অর্থবহ হয়ে উঠেছে। প্রাচীন মিশরে অঙ্কন একটি উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছায়। মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে ছবি আঁকার মাধ্যমে কোনো কিছুকে অমর করে রাখা যায়। তাদের চিত্রকলা বা হায়ারোগ্লিফ ছিল আসলে ছবি এবং অক্ষরের এক চমৎকার মিশ্রণ। তারা মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আঁকার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক নিয়ম মেনে চলত। মিশরীয় চিত্রকলায় আমরা দেখি যে রাজা বা দেবতাদের বড় করে আঁকা হতো এবং সাধারণ মানুষদের ছোট করে, যা সামাজিক স্তরবিন্যাসকে প্রতিফলিত করত। অন্যদিকে, মেসোপটেমীয় সভ্যতায় কাদা মাটির ট্যাবলেটে রেখাচিত্রের মাধ্যমে হিসাব রাখা এবং মানচিত্র তৈরি করা হতো। এখান থেকেই আসলে কারিগরি অঙ্কন বা ‘টেকনিক্যাল ড্রয়িং’-এর সূত্রপাত ঘটে। প্রাচীন গ্রিসে অঙ্কন এবং ভাস্কর্য এক নতুন রূপ পায়। গ্রিক শিল্পীরা প্রথম মানুষের শরীরের সঠিক আনুপাতিক গঠন এবং পেশির বিন্যাস ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। তারা প্রকৃতির হুবহু নকল করার ওপর জোর দিতেন, যাকে বলা হয় ‘মাইমেসিস’। রোমানরা এই ধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায় এবং তারা দেওয়ালে ফ্রেস্কো বা ল্যান্ডস্কেপ আঁকার প্রথা জনপ্রিয় করে তোলে।
মধ্যযুগ ও ধর্মীয় প্রভাব
মধ্যযুগে অঙ্কন মূলত ধর্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ইউরোপে গির্জা এবং মঠগুলোতে বাইবেলের গল্পগুলো ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হতো। এই সময়ে শিল্পীরা খুব একটা বাস্তববাদী ছিলেন না; বরং প্রতীকী চিত্রের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতেন। তবে এই অন্ধকার যুগের শেষের দিকে জত্তোর (Giotto) মতো শিল্পীরা ত্রিমাত্রিক বা ‘থ্রি-ডি’ ইফেক্ট দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। প্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে চীন এবং ভারতে অঙ্কনের একটি আলাদা ধারা তৈরি হয়েছিল। চীনা শিল্পীরা কালি এবং তুলির টানে পাহাড়, নদী এবং প্রকৃতির শান্ত রূপ ফুটিয়ে তুলতেন। তাদের কাছে অঙ্কন ছিল এক ধরণের ধ্যান। ভারতে অজন্তা ও ইলোরা গুহার চিত্রকর্মগুলোতে দেখা যায় কীভাবে রেখার মাধ্যমে মানুষের আবেগ এবং আধ্যাত্মিকতাকে ফুটিয়ে তোলা যায়। পারস্য এবং মুঘল আমলে ‘মিনিয়েচার পেইন্টিং’ বা ক্ষুদ্রাকৃতি অঙ্কনের এক অনন্য ধারা তৈরি হয়, যেখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম রেখা এবং উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।
রেনেসাঁ: অঙ্কনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন
অঙ্কনের ইতিহাসে চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী বা রেনেসাঁ কালকে স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই সময়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো এবং রাফায়েলের মতো কালজয়ী শিল্পীদের হাত ধরে অঙ্কন এক পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বিশ্বাস করতেন যে, একজন ভালো শিল্পী হতে হলে তাকে অবশ্যই একজন বিজ্ঞানী হতে হবে। তিনি মানুষের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে পেশি এবং হাড়ের গঠন বুঝতেন এবং সেগুলো তার স্কেচবুকে নিখুঁতভাবে আঁকতেন। রেনেসাঁ কালেই ‘পার্সপেক্টিভ’ বা পরিপ্রেক্ষিতের সঠিক ব্যবহার আবিষ্কৃত হয়। এর ফলে সমতল কাগজে গভীরতা তৈরি করা সম্ভব হয়, যা ছবিকে জীবন্ত করে তোলে। আলো এবং ছায়ার খেলা বা ‘কিয়ারোস্কোরো’ কৌশল এই সময়েই জনপ্রিয় হয়। রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরাই প্রথম স্কেচিং বা খসড়া অঙ্কনকে একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে মর্যাদা দেন। এর আগে অঙ্কনকে কেবল মূল পেইন্টিংয়ের প্রাথমিক ধাপ মনে করা হতো। কিন্তু এই সময়ে কাগজের প্রাপ্যতা বেড়ে যাওয়ায় শিল্পীরা স্বাধীনভাবে পেন্সিল বা কয়লা দিয়ে তাদের চিন্তাগুলো আঁকতে শুরু করেন।
আধুনিক পেন্সিল ও উপকরণের বিবর্তন
অঙ্কনের বিকাশে উপকরণের ভূমিকা অপরিসীম। শুরুর দিকে মানুষ পাথর, হাড় বা পোড়া কাঠ ব্যবহার করত। মধ্যযুগে রূপার কাঠি বা ‘সিলভার পয়েন্ট’ দিয়ে আঁকা হতো। কিন্তু আধুনিক অঙ্কনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপ্লব আসে গ্রাফাইট আবিষ্কারের পর। ১৫৬৪ সালে ইংল্যান্ডে গ্রাফাইটের খনি আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রথম পেন্সিলের আদিরূপ তৈরি হয়। তবে বর্তমানের কাঠের পেন্সিলটি ১৭৯৫ সালে ফরাসি রসায়নবিদ নিকোলাস-জ্যাক কন্তে আবিষ্কার করেন। তিনি গ্রাফাইটের সাথে কাদা মিশিয়ে বিভিন্ন কাঠিন্যের (Hardness) পেন্সিল তৈরি করেন। এটি ছিল অঙ্কন শিল্পের জন্য একটি মাইলফলক। পেন্সিল আবিষ্কারের ফলে সাধারণ মানুষের জন্য শিল্পচর্চা সহজ হয়ে যায়। এরপর জলরং, তেলরং এবং প্যাস্টেলের সহজলভ্যতা শিল্পীদের সৃজনশীলতাকে আরও বহুমুখী করে তোলে। ১৮শ এবং ১৯শ শতাব্দীতে শিল্পীরা স্টুডিওর বাইরে গিয়ে খোলা আকাশের নিচে ছবি আঁকা শুরু করেন, যা ইম্প্রেশনিজম বা অন্তর্মুদ্রাবাদের জন্ম দেয়। ভ্যান গগ বা ক্লদ মনের মতো শিল্পীরা রঙের স্থূল প্রলেপ এবং রেখার সাহসিকতা দিয়ে অঙ্কনকে নতুন মাত্রা দান করেন।
বিংশ শতাব্দী ও বিমূর্ত অঙ্কন
বিংশ শতাব্দীতে এসে অঙ্কন আর কেবল বাস্তবতার অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকল না। ক্যামেরা আবিষ্কারের পর শিল্পীরা ভাবলেন, যা ক্যামেরা দিয়ে হুবহু ধরে রাখা যায়, তা কেন হাতে আঁকতে হবে? এখান থেকেই শুরু হয় আধুনিকতাবাদের। পাবলো পিকাসো এবং জর্জেস ব্রাক কিউবিজম বা ঘনকবাদের মাধ্যমে বস্তুকে ভেঙে বিভিন্ন কোণ থেকে দেখতে শেখালেন। অঙ্কন হয়ে উঠল মানুষের অবচেতন মনের বহিঃপ্রকাশ। পরাবাস্তববাদ বা সাররিয়ালিজমের মাধ্যমে সালভাদর দালির মতো শিল্পীরা স্বপ্নের জগৎকে ক্যানভাসে নিয়ে এলেন। এই সময়ে রেখা বা ড্রয়িং আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পোলক বা ক্যান্ডিনস্কির কাজে দেখা যায় যে, কোনো নির্দিষ্ট আকার ছাড়াও কেবল রেখা এবং রঙের মাধ্যমে তীব্র আবেগ প্রকাশ করা সম্ভব। অঙ্কন তখন কেবল একটি স্কিল নয়, বরং একটি দর্শনে পরিণত হয়।
ডিজিটাল যুগ এবং অঙ্কনের ভবিষ্যৎ
একবিংশ শতাব্দীতে এসে অঙ্কন প্রযুক্তির সাথে হাত মিলিয়েছে। কম্পিউটার গ্রাফিক্স এবং গ্রাফিক ট্যাবলেটের আবিষ্কার অঙ্কন পদ্ধতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন আর রঙ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় নেই বা কাগজ নষ্ট হওয়ার চিন্তা নেই। ফটোশপ, প্রো-ক্রিয়েট বা ইলাস্ট্রেটরের মতো সফটওয়্যারগুলো শিল্পীদের অসীম সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। ডিজিটাল পেইন্টিং এখন সিনেমা, গেম ডিজাইন এবং বিজ্ঞাপনের জগতে অপরিহার্য। তবে মজার বিষয় হলো, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন, অঙ্কনের মূল ভিত্তি কিন্তু সেই প্রাচীন রেখাই রয়ে গেছে। আজকের স্টাইলাস পেন আসলে সেই আদিম মানুষের হাতের পাথর বা কয়লারই একটি আধুনিক রূপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন ছবি আঁকছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের হাতের ছোঁয়ায় যে আবেগ এবং সংবেদনশীলতা থাকে, তা মেশিন আজও তৈরি করতে পারেনি।
অঙ্কনের আবিষ্কার আসলে মানুষের আত্মপ্রকাশের এক অবিরাম প্রচেষ্টা। এটি কেবল একটি সৃজনশীল কাজ নয়, এটি মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস। গুহার অন্ধকার থেকে আজকের উজ্জ্বল ডিজিটাল স্ক্রিন—অঙ্কন আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে জগতকে দেখতে হয় এবং কীভাবে নিজের কল্পনাকে অন্যের সামনে তুলে ধরতে হয়। এটি বিজ্ঞানের জটিল ডায়াগ্রাম থেকে শুরু করে স্থাপত্যের নকশা, সবখানেই উপস্থিত। অঙ্কন আছে বলেই আমরা ইতিহাসকে দেখতে পাই এবং ভবিষ্যৎকে কল্পনা করতে পারি। যতক্ষণ মানুষ থাকবে, ততক্ষণ মানুষের মনের ভাব প্রকাশের এই আদি ও অকৃত্রিম মাধ্যমটি টিকে থাকবে এবং প্রতিনিয়ত নতুন রূপে আমাদের সামনে ধরা দেবে। অঙ্কন ছিল, আছে এবং থাকবে মানুষের শ্রেষ্ঠতম আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে।



