
(মানুষের গঠন বা অ্যানাটমি ড্রয়িং: ছবিতে প্রাণবন্ত মানুষ ফুটিয়ে তোলার জাদুকরী কৌশল | Human Anatomy)
আর্ট টিউটোরিয়াল সিরিজের গত পর্বে আমরা শিখেছি পরিপ্রেক্ষিত বা পার্সপেক্টিভ ব্যবহার করে কীভাবে দ্বিমাত্রিক পাতায় ত্রিমাত্রিক জগৎ এবং দূরত্বের বিভ্রম তৈরি করা যায়। আমরা দেখেছি কীভাবে ভ্যানিশিং পয়েন্ট ছবির গভীরতা নির্ধারণ করে। আজকের পর্ব ০৫-এ আমরা শিখব চিত্রকলার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অথচ আনন্দদায়ক বিষয়—মানুষের গঠন বা অ্যানাটমি ড্রয়িং (Human Anatomy)। একজন আর্ট স্টুডেন্টের জন্য মানুষের ফিগার এবং পোর্ট্রেট সঠিকভাবে আঁকতে পারা মানে ছবির মধ্যে এক নতুন প্রাণ সঞ্চার করা।

(Image 1: মানুষের মুখমণ্ডলের সঠিক অনুপাত (Proportions) স্পষ্ট করে চিহ্নিত করা হয়েছে।)
মানুষের মুখ আঁকার সময় আমরা প্রায়ই চোখের অবস্থান বা নাকের দৈর্ঘ্য নিয়ে ভুল করি। অ্যানাটমির ভাষায়, মুখমণ্ডলকে কয়েকটি সমান অংশে ভাগ করা যায়। যেমন—দুপাল্লা চোখের মাঝখানে ঠিক একটি চোখের সমান গ্যাপ থাকে। আবার কপাল থেকে ভ্রু, ভ্রু থেকে নাকের শেষ এবং নাকের শেষ থেকে চিবুক—এই তিনটি অংশ প্রায় সমান হয়। ছবিতে দেখুন কীভাবে একটি ডিম্বাকৃতি শেপকে ভাগ করে সঠিক জায়গায় চোখ, নাক ও ঠোঁট বসানো হয়েছে। একেই বলা হয় লুমিস মেথড (Loomis Method)।

(Image 2: মানুষের ফিগার ড্রয়িংয়ের জন্য ‘এইট হেডস’ (8 Heads) থিওরি দেখানো হয়েছে।)
পুরো মানুষের শরীর আঁকার ক্ষেত্রে প্রফেশনাল শিল্পীরা ‘এইট হেডস’ থিওরি অনুসরণ করেন। অর্থাৎ, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উচ্চতা তার মাথার দৈর্ঘ্যের প্রায় আট গুণ হয়। শরীরের বিভিন্ন অংশ যেমন বুক, কোমর এবং হাঁটু কোন ‘হেড’ লেভেলে থাকবে, তা এই নিয়মে ধরা সহজ হয়। শুরুতে সরাসরি ডিটেইল না এঁকে মানুষের শরীরকে গোলক (Sphere), সিলিন্ডার (Cylinder) এবং কিউব (Cube) হিসেবে কল্পনা করুন। একে বলা হয় জেসচার ড্রয়িং (Gesture Drawing)।

(Image 3: হাতের তালু এবং আঙুলের গঠন জ্যামিতিক আকারে ভেঙে দেখানো হয়েছে।)
হাত এবং পা আঁকা অনেক সময় কঠিন মনে হতে পারে। তবে এগুলোকেও ছোট ছোট ব্লকে ভাগ করে নিলে সহজ হয়ে যায়। হাতের তালুকে একটি চারকোণা বক্স এবং আঙুলগুলোকে ছোট ছোট সিলিন্ডার হিসেবে ভাবুন। জয়েন্ট বা গিঁটগুলোর অবস্থান বুঝে ড্রয়িং করলে হাত অনেক বেশি বাস্তবসম্মত দেখায়। মনে রাখবেন, হাড় ও পেশির অবস্থানই চামড়ার ওপরের আকার নির্ধারণ করে।

(Image 4: একটি জটিল কম্পোজিশনে একাধিক মানুষের জেসচার এবং মুভমেন্টের সঠিক ব্যবহার।)
যখন আপনি কোনো দৃশ্য আঁকবেন যেখানে মানুষ চলাফেরা করছে, তখন জেসচার ড্রয়িং খুব কাজে দেয়। মানুষের শরীরের ভারসাম্য (Balance) এবং ভর (Weight) কোন পায়ের ওপর পড়ছে, তা বুঝতে পারলে আপনার আঁকা মানুষগুলো স্থির না থেকে গতিশীল মনে হবে। ছবিতে দেখুন কীভাবে পরিপ্রেক্ষিতের নিয়ম মেনে দূরের মানুষগুলো ছোট এবং সামনের মানুষগুলো ডিটেইলডভাবে আঁকা হয়েছে।

(Image 5: একটি স্টিল লাইফ এবং মানুষের পোর্ট্রেটের সমন্বয়, যেখানে আলোর উৎস অনুযায়ী মানুষের মুখে আলো-ছায়া ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।)
প্র্যাকটিক্যাল অংশে আপনার অনুশীলন হলো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পোর্ট্রেট বা পরিবারের সদস্যদের স্কেচ করা। শুরুতে ডিটেইল চোখের মণি বা ঠোঁটের ভাঁজ না এঁকে শুধু বড় বড় ছায়া এবং আলোর জায়গাগুলো চিহ্নিত করুন। ৩ নং পর্বে শেখা আলো-ছায়ার নিয়ম এখানেও প্রয়োগ করুন। পেন্সিলের হালকা প্রেশারে (HB বা 2B) বেসিক স্ট্রাকচার তৈরি করুন এবং পরে 4B বা 6B দিয়ে গভীরতা আনুন।
মানুষের গঠন আয়ত্ত করতে প্রচুর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। বাসে, পার্কে বা স্টেশনে যখনই মানুষ দেখবেন, মনে মনে তাদের জ্যামিতিক ফর্মে ভেঙে নেওয়ার চেষ্টা করুন। প্রতিদিন অন্তত ৫টি দ্রুত জেসচার স্কেচ আপনার হাতকে আরও সাবলীল করে তুলবে। পরবর্তী পর্বে আমরা শিখব কীভাবে প্রকৃতি থেকে সরাসরি (Live Sketching) ল্যান্ডস্কেপ ড্রয়িং করা যায়। আঁকতে থাকুন, কারণ প্রতিটি রেখাই আপনাকে একজন দক্ষ শিল্পী হওয়ার পথে এগিয়ে দিচ্ছে।









