ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমা ও দুর্গাপূজা: কেবল উৎসব নয়, বাঙালির এক মহাজাগতিক শিল্পকলা

ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমা ও দুর্গাপূজা: কেবল উৎসব নয়, বাঙালির এক মহাজাগতিক শিল্পকলা

দুর্গাপূজা: শিল্প ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, কিন্তু সেই সব উৎসবের মধ্যমণি হলো শারদীয়া দুর্গাপূজা। ২০২১ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) কলকাতার দুর্গাপূজাকে ‘Intangible Cultural Heritage of Humanity’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এই স্বীকৃতি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য নয়, বরং এটি একটি জাতির সম্মিলিত সৃজনশীলতা, কারুশিল্প এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির উদযাপন। দুর্গাপূজা এখন আর কেবল মন্দিরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত শিল্প প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।

শিল্পের এক বিশাল কোলাজ: মণ্ডপ থেকে প্রতিমা

দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর দৃশ্যমান শিল্পকলা। প্রতি বছর কয়েক মাস আগে থেকে মৃৎশিল্পীরা কুমোরটুলিতে পরম মমতায় তৈরি করেন মা দুর্গার প্রতিমা। মাটির ছোঁয়া আর রঙের জাদুতে প্রাণহীন কাঠামো হয়ে ওঠে জীবন্ত। অন্যদিকে, প্যান্ডেল বা মণ্ডপ নির্মাণের ক্ষেত্রে এখন দেখা যায় থিম বা বিষয়ভিত্তিক ভাবনার জয়জয়কার। কোথাও তৈরি হয় পুরনো জমিদার বাড়ি, কোথাও আবার বিমূর্ত কোনো চিন্তাকে বাঁশ, কাপড় আর অপ্রচলিত সামগ্রী দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। এই নির্মাণশৈলী প্রমাণ করে যে সাধারণ কারিগররা আধুনিক স্থপতিদের চেয়ে কোনো অংশে কম নন।

কুমোরটুলি: সৃজনশীলতার আঁতুড়ঘর

কলকাতার কুমোরটুলি হলো সেই জায়গা যেখানে শিল্পের জন্ম হয়। গঙ্গার ধারের এই ঘিঞ্জি গলিতে যুগ যুগ ধরে কারিগররা মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। প্রতিটি প্রতিমার চোখ আঁকা বা ‘চক্ষুদান’ এক আধ্যাত্মিক এবং শৈল্পিক অভিজ্ঞতা। বর্তমানে কুমোরটুলির প্রতিমা কেবল বাংলা বা ভারতে নয়, পাড়ি দিচ্ছে আমেরিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো সুদূর মহাদেশে। এটি বাংলার এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্তম্ভ।

থিম পূজা বনাম সাবেকিয়ানা

বিগত কয়েক দশকে দুর্গাপূজায় ‘থিম’ সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কোনো মণ্ডপ হয়তো লুপ্তপ্রায় কোনো গ্রাম্য শিল্পকে তুলে ধরছে, আবার কোনোটি পরিবেশ দূষণ বা বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মানুষকে সচেতন করছে। এই থিমগুলো পর্যটকদের যেমন আকৃষ্ট করে, তেমনি অনেক হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্পকে নতুন করে প্রাণ দেয়। তবে এর পাশাপাশি সাবেকি বা বারোয়ারি পূজার এক আলাদা মাহাত্ম্য রয়েছে। একচালার প্রতিমা আর ডাকের সাজের আভিজাত্য আজও বহু মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।

অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্প্রীতি

দুর্গাপূজার অন্যতম সুন্দর দিক হলো এর সর্বজনীনতা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে শামিল হয়। ইউনেস্কো এই ‘Inclusivity’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকেই বিশেষভাবে সম্মান জানিয়েছে। পূজার কদিন ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ মুছে যায়। রাস্তার ধারের হকার থেকে শুরু করে বড় শোরুম—সবারই মুখে হাসির রেখা দেখা দেয়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি বাংলার অর্থনীতির চাকা সচল রাখার এক প্রধান উৎসব। কয়েক লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই উৎসবের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন।

ঢাকের আওয়াজ ও শিউলি ফুলের গন্ধ

দুর্গাপূজার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ঢাকের বাদ্যি। এই বাদ্যযন্ত্রের তালের সাথে মিশে আছে বাঙালির আবেগ। ধুনুচি নাচের সময় ঢাকের আওয়াজ এক ধরণের উন্মাদনা তৈরি করে যা বিশ্বের আর কোনো উৎসবে দেখা যায় না। এর সাথে শরতের নীল আকাশ আর শিউলি ফুলের সুগন্ধ মিলে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের যুগেও ঢাকের গুরুত্ব একবিন্দু কমেনি, যা আমাদের লোকসংস্কৃতির টিকে থাকার প্রমাণ দেয়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আগামী দিনের পথ

ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী পর্যটন শিল্পের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিদেশি পর্যটকরা এখন এই উৎসবের সময় কলকাতায় ভিড় জমাচ্ছেন এই মহাজাগতিক শিল্পকলা উপভোগ করতে। এই ঐতিহ্যকে বজায় রাখতে হলে আমাদের কারিগরদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎসব পালনের ওপর জোর দিতে হবে। দুর্গাপূজা আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে একসাথে লালন করতে হয়।

উপসংহার ছাড়াই বলা যায়, দুর্গাপূজা বাংলার আত্মার দর্পণ। এটি এমন এক ক্যানভাস যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রঙের ছোঁয়া লাগে, কিন্তু এর মূল সুরটি সবসময় এক—অশুভের বিনাশ আর শুভর জয়গান।

Scroll to Top