
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ও সুস্থ জীবন
ওজন কমানো বা মেদ ঝরানোর কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভাসে জিমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানো কিংবা পছন্দের খাবার বর্জন করা। কিন্তু আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে, ‘আপনি কী খাচ্ছেন’ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ‘আপনি কখন খাচ্ছেন’। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই জনপ্রিয় হয়েছে ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ (Intermittent Fasting)। এটি কোনো প্রথাগত ডায়েট চার্ট নয়, বরং এটি খাওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সূচী বা প্যাটার্ন। এই পদ্ধতিতে শরীরকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অভুক্ত রাখা হয়, যাতে জমানো চর্বি শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের পেছনের বিজ্ঞান: অটোফ্যাজি
২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান ‘অটোফ্যাজি’ (Autophagy) আবিষ্কারের জন্য। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের মূল ভিত্তি হলো এটি। যখন আমরা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকি, তখন আমাদের শরীরের কোষগুলো নিজেদের পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় কোষগুলো তাদের ভেতরে থাকা পুরনো এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন বা কোষাণুগুলো খেয়ে ফেলে এবং নতুন কোষ গঠনে সাহায্য করে। এটি শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ করে এবং অকাল বার্ধক্য রোধে কাজ করে।
জনপ্রিয় পদ্ধতিগুলো কী কী?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের বেশ কিছু ধরণ রয়েছে, তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো **১৬/৮ পদ্ধতি**। এখানে দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ ঘণ্টা উপবাস থাকতে হয় এবং বাকি ৮ ঘণ্টার মধ্যে খাবার গ্রহণ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি দুপুর ১টায় দুপুরের খাবার খান এবং রাত ৯টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করেন, তবে পরের দিন দুপুর ১টা পর্যন্ত আপনি ১৬ ঘণ্টা উপবাসে থাকলেন। এছাড়া রয়েছে ৫:২ পদ্ধতি (সপ্তাহে ৫ দিন সাধারণ খাবার এবং ২ দিন ৫০০-৬০০ ক্যালরি খাওয়া) এবং ২৪ ঘণ্টা উপবাসের মতো পদ্ধতি। তবে নতুনদের জন্য ১৬/৮ পদ্ধতি সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর।
ইনসুলিন লেভেল ও মেদ কমানোর জাদুকরী প্রভাব
আমরা যখনই কিছু খাই, আমাদের শরীরে ইনসুলিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। ইনসুলিনের প্রধান কাজ হলো রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষে পাঠানো এবং অতিরিক্ত শক্তি চর্বি হিসেবে জমা রাখা। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায়। ফলে শরীর জমানো চর্বি পোড়াতে বাধ্য হয় (Fat burning mode)। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।
মানসিক সতর্কতা ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কেবল শরীরের মেদ কমায় না, এটি মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাসের ফলে মস্তিষ্কে ‘ব্রেইন-ডিরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর’ (BDNF) নামক এক ধরণের প্রোটিন বৃদ্ধি পায়। এটি নতুন নিউরন তৈরিতে এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। অনেক মানুষ এই পদ্ধতি অনুসরণ করার পর জানিয়েছেন যে, তাদের কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে এবং দুপুরের খাবারের পর যে অলসতা কাজ করত, তা দূর হয়েছে।
হার্টের সুরক্ষা ও দীর্ঘায়ু
হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এক আশীর্বাদ। এটি শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি শরীরের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। পশুদের ওপর চালানো বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে খাবার গ্রহণ আয়ু বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। মানুষের ক্ষেত্রেও এটি দীর্ঘ এবং রোগমুক্ত জীবন পেতে সাহায্য করতে পারে।
সতর্কতা: কাদের জন্য এটি নয়?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কার্যকর হলেও এটি সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা এবং যাদের আগে থেকে কোনো জটিল রোগ বা ইটিং ডিজঅর্ডার আছে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এছাড়া উপবাসের সময় প্রচুর পরিমাণে জল, চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি বা গ্রিন টি পান করা জরুরি যাতে শরীর ডিহাইড্রেটেড না হয়ে যায়। মনে রাখবেন, উপবাসের পরের ৮ ঘণ্টায় জাঙ্ক ফুড খেলে কিন্তু কোনো লাভ হবে না; পুষ্টিকর খাবার গ্রহণই আসল চাবিকাঠি।
পরিশেষে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কেবল একটি ট্রেন্ড নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের একটি ফিরে আসা রূপ। আপনার শরীরকে মাঝে মাঝে বিরতি দিন, এটি নিজেকে মেরামত করার সময় পাবে এবং আপনি পাবেন এক সুস্থ, সুন্দর জীবন।




