
বর্তমান সময়ের ব্যস্ত জীবনযাত্রা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস আর অত্যধিক মানসিক চাপ আমাদের শরীরের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘উচ্চ রক্তচাপ’ বা হাইপারটেনশন। আগে ভাবা হতো এটি কেবল বয়স্কদের রোগ, কিন্তু জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে অন্য কথা। বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সি তরুণদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন এই সমস্যায় আক্রান্ত। ভারতে প্রায় ৫০ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৬ শতাংশেরও বেশি মহিলা এই ‘সাইলেন্ট কিলার’-এর শিকার।
তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। জীবনধারায় সামান্য পরিবর্তন আর নিয়মিত কিছু সহজ যোগাসনের মাধ্যমেই আপনি উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। আনন্দবাজারি ঘরানায় আজকের প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব এমন তিনটি কার্যকরী যোগাসন নিয়ে, যা আপনার রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে ম্যাজিকের মতো কাজ করবে।
কেন বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ?
চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ সরাসরি আমাদের লাইফস্টাইলের সঙ্গে যুক্ত। অত্যধিক নুন খাওয়া, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, স্থূলতা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব— এই সবকটিই রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। যখন ধমনীর দেওয়ালে রক্ত চলাচলের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়, তখনই তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। সঠিক সময়ে একে নিয়ন্ত্রণ না করলে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সেরা ৩টি যোগাসন
জিমে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম নয়, বাড়িতে বসেই মাত্র ১৫-২০ মিনিট সময় দিয়ে আপনি এই আসনগুলো করতে পারেন।
১. ভুজঙ্গাসন (Cobra Pose)
এই আসনটি মেরুদণ্ড নমনীয় করার পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে সাহায্য করে এবং মানসিক চাপ কমায়।
- পদ্ধতি: প্রথমে একটি ম্যাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। দুই হাত কাঁধের দু’পাশে রাখুন। এবার গভীর শ্বাস নিতে নিতে হাতের তালুর ওপর ভর দিয়ে শরীরের সামনের অংশ (মাথা ও বুক) ধীরে ধীরে মাটি থেকে ওপরে তুলুন। নাভি পর্যন্ত অংশ যেন মাটি থেকে ৩-৪ ইঞ্চি ওপরে থাকে। এই অবস্থায় ১০ সেকেন্ড থেকে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন। এরপর ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন। এভাবে ৪-৫ বার অভ্যাস করুন।
২. সেতুবন্ধনাসন (Bridge Pose)
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সেতুবন্ধনাসন অত্যন্ত কার্যকর। এটি মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে এবং হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে।
- পদ্ধতি: মেঝের ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন। দুই হাঁটু ভাঁজ করে পা দুটো যতটা সম্ভব নিতম্বের কাছাকাছি রাখুন। এবার ধীরে ধীরে কোমর ও পিঠ মাটি থেকে ওপরের দিকে তুলুন। আপনার হাত দুটি টানটান করে গোড়ালি স্পর্শ করার চেষ্টা করুন অথবা মাটির ওপর সমান্তরালভাবে রাখুন। ১০-১৫ সেকেন্ড এই অবস্থানে থাকুন এবং ৪-৫ বার পুনরাবৃত্তি করুন।
৩. পর্বতাসন (Mountain Pose)
পুরো শরীরের পেশিকে সচল করতে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এই আসনের বিকল্প নেই।
- পদ্ধতি: প্রথমে হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে বসে হাতের তালু ও পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে নিতম্বকে ওপরের দিকে ঠেলে দিন। আপনার শরীর যেন দেখতে অনেকটা ইংরেজি ‘A’ অক্ষরের মতো হয়। খেয়াল রাখবেন হাঁটু বা কনুই যেন ভাঁজ না হয়। বুক থুতনির দিকে নামানোর চেষ্টা করুন। ৩-৫ বার এটি অভ্যাস করলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং রক্তচাপ কমে।
যোগাসনের পাশাপাশি আরও কিছু টিপস
কেবল যোগাসন করলেই হবে না, দীর্ঘস্থায়ী সুফলের জন্য আপনাকে আরও কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে:
- নুন কম খান: খাবারে কাঁচা নুন খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন। নুন শরীরে জল ধরে রাখে, যা রক্তচাপ বাড়ায়।
- পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: কলা, পালং শাক এবং ডালের মতো পটাশিয়াম যুক্ত খাবার খান, যা সোডিয়ামের প্রভাব কমিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
- পর্যাপ্ত ঘুম: দিনে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম শরীরের ক্লান্তি দূর করে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে।
- মানসিক প্রশান্তি: নিয়মিত প্রাণায়াম বা ধ্যানের অভ্যাস করুন। মন শান্ত থাকলে রক্তচাপ বাড়ার সুযোগ পায় না।
উচ্চ রক্তচাপ মানেই সারাজীবনের জন্য ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা নয়। যদি প্রাথমিক স্তরেই আপনি সচেতন হন এবং প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট এই যোগাসনগুলো করেন, তবে সুস্থ থাকা সম্ভব। মনে রাখবেন, ওষুধ সাময়িক উপশম দিলেও দীর্ঘস্থায়ী সুস্থতার চাবিকাঠি আপনার নিজের জীবনধারার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
আজ থেকেই শুরু হোক আপনার সুস্থতার পথে যাত্রা। শরীর সুস্থ থাকলে মনও থাকবে ফুরফুরে!
সতর্কবার্তা: কোনও জটিল শারীরিক সমস্যা বা হার্টের অসুখ থাকলে এই যোগাসনগুলো করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা যোগ-প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিন।










