
কলকাতার ট্রাম: এক জীবন্ত ঐতিহ্য
কলকাতার ব্যস্ত রাস্তার চিরচেনা শব্দগুলোর মধ্যে একটি হলো ট্রামের টুং-টাং ঘণ্টা। আধুনিক মেট্রো, দ্রুতগতির এসি বাস আর অ্যাপ-ক্যাব যখন শহরকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে, তখনও কলকাতার রাজপথে অত্যন্ত ধীরলয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে ভারতের একমাত্র সচল ট্রাম পরিষেবা। ১৮৭৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এটি কলকাতার আত্মার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ এশিয়ার প্রাচীনতম এই বৈদ্যুতিক যানটি কীভাবে সময়ের সাথে লড়াই করে আজও টিকে আছে, সেই গল্পই আমরা জানব।
ঘোড়ায় টানা গাড়ি থেকে বৈদ্যুতিক ট্রাম: ইতিহাসের পাতায় যাত্রা
কলকাতায় ট্রামের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৩ সালে। তবে শুরুতে এটি কিন্তু বিদ্যুতে চলত না। শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত সেই ট্রাম টানা হতো ঘোড়া দিয়ে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে মালপত্র পরিবহনের সুবিধার্থে এটি চালু করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৮০ সালে ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি (CTC) গঠিত হয়। উনিশ শতকের শেষ দিকে বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের ব্যবহার শুরু হলেও তা খুব একটা টেকসই হয়নি। অবশেষে ১৯০২ সালে ভারত তথা এশিয়ার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিষেবা কলকাতায় চালু হয়, যা ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই যানটি কলকাতার সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থাপত্য ও নকশা: যেন এক চলন্ত কাষ্ঠকলা
কলকাতার ট্রামের নকশা অত্যন্ত স্বতন্ত্র। এর কাঠের কাঠামো, জানলার শিক আর সেই পুরনো আমলের হাতলগুলো মানুষকে মুহূর্তেই গত শতাব্দীর কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ট্রামের কামরাগুলো সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত থাকে—প্রথম শ্রেণি এবং দ্বিতীয় শ্রেণি (যদিও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এটি এক করে দেওয়া হয়েছে)। ট্রামের ভেতরে বসলে মনে হয় যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছে। ট্রামের ধীরগতি আপনাকে শহরের স্থাপত্য, রাস্তার ধারের পুরনো দোকান এবং মানুষের জীবনযাত্রা দেখার এক অনন্য সুযোগ করে দেয়। সম্প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য ‘স্মরণিকা’ নামক ট্রাম মিউজিয়াম এবং এসি ট্রামও চালু করা হয়েছে, যেখানে এই ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস সংরক্ষিত আছে।
সাহিত্যে ও সিনেমায় কলকাতার ট্রাম
কলকাতার সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র ট্রাম ছাড়া ভাবাই যায় না। জীবনানন্দ দাসের কবিতায় ট্রামের উল্লেখ থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন বা ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা—সবখানেই ট্রাম এসেছে এক নীরব সাক্ষী হিসেবে। সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’ বা হালের সুজিত সরকারের ‘পিকু’—সিনেমার পর্দায় ট্রাম কলকাতাকে এক নস্টালজিক রূপ দেয়। আধুনিক হিন্দি সিনেমা যেমন ‘বরফি’ বা ‘কাহানি’ তেও কলকাতাকে চেনাতে ট্রামকেই প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রাম কেবল রাস্তা দিয়ে চলে না, এটি বাঙালির আবেগ আর স্মৃতির রেললাইনেও সমানভাবে দৌড়ায়।
পরিবেশবান্ধব পরিবহন হিসেবে ট্রামের গুরুত্ব
বর্তমান বিশ্বে যখন বায়ুদূষণ এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং এক বিরাট দুশ্চিন্তার কারণ, তখন ট্রাম হতে পারে সবচেয়ে আদর্শ পরিবহন। এটি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত এবং এতে কোনো ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হয় না। যেখানে পৃথিবীর বহু উন্নত শহর (যেমন মেলবোর্ন বা লিসবন) তাদের ট্রাম নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করছে, সেখানে কলকাতায় ট্রাম রুট কমে আসা কিছুটা দুঃখজনক। ট্রামলাইনগুলো রাস্তার মাঝখানে হওয়ায় যানজটের অজুহাত দেওয়া হলেও, পরিকল্পিত ট্রাম রুট পরিবেশ বাঁচাতে এবং যাতায়াত খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিলুপ্তির আশঙ্কা এবং সংরক্ষণের দাবি
এক সময় কলকাতার অলিগলি জুড়ে কয়েক ডজন ট্রাম রুট চালু থাকলেও, মেট্রো রেলের কাজ এবং রাস্তা প্রশস্ত করার চাপে বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি রুট সচল আছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং ধীরগতির কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে এর জনপ্রিয়তা কমলেও, হেরিটেজ প্রেমীরা এই ট্রাম বাঁচিয়ে রাখার জোর দাবি জানিয়ে আসছেন। কলকাতা মানেই যেমন হাওড়া ব্রিজ বা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ঠিক তেমনই ট্রাম ছাড়া কলকাতার পরিচয় অসম্পূর্ণ। ট্রামকে কেবল একটি যান হিসেবে নয়, বরং একটি ‘হেরিটেজ অন হুইলস’ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ ভাবনা: আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
ট্রামকে টিকিয়ে রাখতে হলে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া জরুরি। ট্রামলাইনগুলোর সংস্কার, ফাইবার গ্লাস বডির হালকা ট্রাম এবং সঠিক সময়সূচী মেইনটেইন করলে এটি আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। পর্যটকদের জন্য জয়রাইড বা বিশেষ ক্যাফে-ট্রাম একটি দারুণ আইডিয়া হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যে ট্রাম মিউজিয়াম এবং ট্রাম ক্যাফে নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা আশা করি, কলকাতার রাজপথ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে না এই টুং-টাং শব্দ। এটি টিকে থাকবে আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের গৌরবান্বিত ইতিহাসের প্রতিনিধি হিসেবে।


