
আধুনিক ডায়েটের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘চিনি’কে। একে বিজ্ঞানীরা প্রায়ই ‘সাদা বিষ’ বা ‘মিষ্টি বিষ’ বলে অভিহিত করেন। আমাদের প্রতিদিনের চা, কফি, কোমল পানীয়, বিস্কুট থেকে শুরু করে এমনকি পাউরুটি বা সসেও লুকিয়ে থাকে প্রচুর পরিমাণে চিনি। স্বাদগ্রন্থিকে তৃপ্তি দিলেও এই অতিরিক্ত চিনি আমাদের শরীরের ভেতরটা ধীরে ধীরে ধ্বংস করে ফেলে। প্রাচীনকালে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে প্রাকৃতিক চিনি থাকলেও প্রক্রিয়াজাত চিনির কোনো স্থান ছিল না। কিন্তু বর্তমানের ‘অ্যাডেড সুগার’ বা যোগ করা চিনি আমাদের বিপাকীয় ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলছে। কেন আমাদের এই মুহূর্ত থেকেই চিনির পরিমাণ কমানো উচিত, তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করা প্রয়োজন।
শরীরের ওজন বৃদ্ধি ও মেদ ভুঁড়ি
অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের ওজনের ওপর। চিনিতে থাকে প্রচুর ক্যালোরি কিন্তু কোনো পুষ্টিগুণ নেই। যখন আমরা চিনিযুক্ত খাবার খাই, বিশেষ করে ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ পানীয়, তখন আমাদের মস্তিস্ক ‘তৃপ্তি’ অনুভব করে না। ফলে আমরা অতিরিক্ত খেয়ে ফেলি। এই অতিরিক্ত চিনি লিভারে গিয়ে চর্বি হিসেবে জমা হয়। একে বলা হয় ‘ভিসারাল ফ্যাট’, যা আমাদের পেটের চারপাশে জমা হয়ে মেদ ভুঁড়ি তৈরি করে। এটি কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রশ্ন নয়, পেটের এই চর্বি টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণা বলছে, যারা নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় পান করেন, তাদের স্থূলতার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস
চিনি খাওয়ার সাথে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। যখন আমরা চিনি খাই, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। এই গ্লুকোজকে কোষে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন হরমোন নিঃসৃত হয়। আমরা যদি সারাদিন চিনিযুক্ত খাবার খেতে থাকি, তবে শরীরকে অবিরাম ইনসুলিন তৈরি করতে হয়। এক সময় আমাদের কোষগুলো এই ইনসুলিনের প্রতি সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেয়, যাকে বলা হয় ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে এবং মানুষ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যা শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ধীরে ধীরে বিকল করে দেয়।
হৃদরোগের ঝুঁকি এবং উচ্চ রক্তচাপ
অনেকে মনে করেন কেবল চর্বিযুক্ত খাবার খেলেই হার্টের সমস্যা হয়, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে চিনি হার্টের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর। উচ্চ চিনিযুক্ত খাদ্য রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ধমনীর দেওয়ালে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং ধমনী শক্ত হয়ে পড়ে (Atherosclerosis)। যারা তাদের প্রতিদিনের ক্যালোরির ২৫ শতাংশ বা তার বেশি চিনি থেকে গ্রহণ করেন, তাদের হৃদরোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ। চিনি রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়, যা পরোক্ষভাবে উচ্চ রক্তচাপের জন্য দায়ী।
ত্বকের অকাল বার্ধক্য ও ব্রণের সমস্যা
চিনি কেবল শরীরের ভেতর নয়, বাইরেও ছাপ ফেলে। অতিরিক্ত চিনি রক্তে প্রোটিনের সাথে মিশে এক ধরণের ক্ষতিকর অণু তৈরি করে যাকে বলা হয় ‘AGEs’ (Advanced Glycation End-products)। এই অণুগুলো আমাদের ত্বকের কোলাজেন এবং ইলাস্টিন তন্তুকে ধ্বংস করে দেয়, যা ত্বককে টানটান এবং তরুণ রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে চামড়া ঝুলে যায় এবং অকাল বার্ধক্যের বলিরেখা দেখা দেয়। এছাড়া চিনি ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের নিঃসরণ ত্বরান্বিত করে, যা ত্বকে সিবাম বা তেলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং তীব্র ব্রণের সমস্যা সৃষ্টি করে।
লিভারের ক্ষতি ও ফ্যাটি লিভার ডিজিজ
চিনির একটি বড় অংশ হলো ফ্রুক্টোজ। গ্লুকোজ শরীরের প্রতিটি কোষ শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারলেও ফ্রুক্টোজ কেবল লিভার বা যকৃৎ প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। যখন আমরা অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ (যেমন কোমল পানীয় বা ক্যান্ডি থেকে) গ্রহণ করি, লিভার তা সামলাতে না পেরে চর্বিতে রূপান্তর করে। এই চর্বি লিভারে জমতে জমতে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ (NAFLD) তৈরি করে। এটি এক সময় লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক পর্যায়ে যেতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অতিরিক্ত চিনি লিভারের ঠিক ততটাই ক্ষতি করে যতটা অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা মদ করে থাকে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও এনার্জি ক্র্যাশ
চিনি খাওয়ার পর আমরা এক ধরণের তাৎক্ষণিক এনার্জি বা শক্তি অনুভব করি, যাকে বলা হয় ‘সুগার রাশ’। কিন্তু এই শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। রক্তে শর্করার মাত্রা যতটা দ্রুত বাড়ে, ঠিক ততটাই দ্রুত আবার কমে যায়, যাকে বলা হয় ‘সুগার ক্র্যাশ’। এর ফলে আমরা আগের চেয়েও বেশি ক্লান্ত, খিটখিটে এবং অবসাদগ্রস্ত বোধ করি। দীর্ঘমেয়াদী চিনি সেবন মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে, যা আসক্তি তৈরি করে এবং মানসিক অস্থিরতা বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ চিনিযুক্ত খাবার ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
চিনির স্বাস্থ্যকর বিকল্প ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন
চিনি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে, তবে সচেতন থাকলে এর ব্যবহার কমানো সম্ভব। সাদা চিনির বদলে আপনি মধু, খেজুর বা কিশমিশ ব্যবহার করতে পারেন। স্টিভিয়া (Stevia) নামক প্রাকৃতিক ভেষজ একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে কারণ এতে ক্যালোরি নেই। প্রক্রিয়াজাত জুস বা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বদলে গোটা ফল খাওয়ার অভ্যাস করুন, কারণ ফলের ফাইবার বা আঁশ চিনির শোষণকে ধীর করে দেয়। চা বা কফিতে চিনির বদলে দারুচিনির গুঁড়ো ব্যবহার করলে তা মিষ্টির স্বাদ দেওয়ার পাশাপাশি মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে। লেবেল পড়ার অভ্যাস করুন—বাজারের সস, ইয়োগার্ট বা সিরিয়ালে প্রচুর ‘হিডেন সুগার’ থাকে।




