
বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন হলো ছৌ নাচ যা কেবল একটি নৃত্যশৈলী নয় বরং বীরত্ব এবং পৌরাণিক সংগ্রামের এক জীবন্ত দৃশ্যকাব্য। পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ করে পুরুলিয়া সংলগ্ন এলাকায় এই নাচের আদি নিবাস হলেও আজ এটি ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের তালিকায় স্থান করে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত। ছৌ নাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর বিশালাকার এবং অদ্ভুত সুন্দর মুখোশগুলো। একজন সাধারণ দর্শক যখন এই নাচ দেখেন তখন তিনি কেবল নর্তকের শারীরিক কসরত বা লাফের ভঙ্গি দেখেন কিন্তু এই প্রতিটি মুখোশের পেছনে যে সূক্ষ্ম কারিগরি বিজ্ঞান এবং হাজার বছরের পৌরাণিক কাহিনী লুকিয়ে আছে তা জানলে বিস্মিত হতে হয়। ছৌ নাচের প্রতিটি মুখোশ তৈরির প্রক্রিয়া এক বিশাল গবেষণার বিষয়। এই মুখোশগুলো কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয় বরং এগুলো একেকটি চরিত্রের প্রাণভ্রমরা। মুখোশ তৈরির কারিগররা মূলত পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামের আদি বাসিন্দা যারা বংশ পরম্পরায় এই কাজ করে আসছেন। এই কারিগরি প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে আমরা এক অদ্ভুত লোকজ বিজ্ঞানের সন্ধান পাই। একটি মুখোশ তৈরির জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হয় স্থানীয় নদীতীরের বিশেষ এক ধরনের এঁটেল মাটি। এই মাটি দিয়ে প্রথমে চরিত্রের একটি ছাঁচ তৈরি করা হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে এই এঁটেল মাটির প্লাস্টিসিটি বা নমনীয়তা অত্যন্ত বেশি যা সূক্ষ্ম কারুকাজ করতে সাহায্য করে। এই ছাঁচের ওপর পাতলা কাগজের স্তর বসানো হয় এবং তার ওপর দেওয়া হয় পুরনো সুতির কাপড়ের আস্তরণ। এখানে যে আঠা ব্যবহার করা হয় তা কোনো আধুনিক কেমিক্যাল আঠা নয় বরং তেঁতুলের বীজ সেদ্ধ করে তৈরি করা এক প্রাকৃতিক আঠা। এই আঠার স্থায়িত্ব এবং পরিবেশবান্ধব গুণাবলী আধুনিক বিজ্ঞানের যেকোনো আঠাকে টেক্কা দিতে পারে। কাগজের স্তরগুলো শুকিয়ে গেলে তার ওপর খড়িমাটির প্রলেপ দেওয়া হয় যা রঙ করার জন্য একটি মসৃণ বেস তৈরি করে। রঙের ক্ষেত্রেও শিল্পীরা মূলত খনিজ বা প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া রঙ পছন্দ করেন যদিও আধুনিক যুগে সিন্থেটিক রঙের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো মুখোশটির ওজন নিয়ন্ত্রণ করা। ছৌ নাচে নর্তককে প্রচুর লাফঝাঁপ ও শারীরিক কসরত করতে হয় তাই মুখোশটি যদি বেশি ভারী হয় তবে তা নর্তকের ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। আবার খুব হালকা হলে তা ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। এই ভারসাম্য বজায় রাখার যে জ্ঞান তা সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতালব্ধ প্রকৌশল। মুখোশের চোখ এবং নাকের ছিদ্রগুলো এমনভাবে করা হয় যাতে নর্তক পর্যাপ্ত অক্সিজেন পান এবং সামনে থাকা প্রতিপক্ষ বা দলের সদস্যদের অবস্থান স্পষ্ট দেখতে পান। এটি কেবল আর্ট নয় বরং হিউম্যান ফ্যাক্টরস ইঞ্জিনিয়ারিং বা এরগোনোমিকসের এক চমৎকার উদাহরণ।
ছৌ নাচের পৌরাণিক পটভূমি এই শিল্পকে আরও গভীরতা দান করে। অধিকাংশ ছৌ নাচের পালা মূলত রামায়ণ মহাভারত এবং পুরাণ থেকে নেওয়া। মহিষাসুর মর্দিনী বা কিরাত অর্জুন যুদ্ধের মতো বীরত্বপূর্ণ কাহিনীগুলো এখানে অভিনীত হয়। এই কাহিনীগুলোর পেছনেও রয়েছে প্রতীকী অর্থ। প্রতিটি মুখোশের রঙ এবং আকার এক একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন দেবী দুর্গার মুখোশটি সাধারণত হলুদ বা সোনালী রঙের হয় যা পবিত্রতা এবং শক্তির প্রতীক। অন্যদিকে অসুরের মুখোশটি হয় ঘন কালো বা কালচে সবুজ যা তামসিক গুণ বা অন্ধকারের প্রতীক। বীর রস বা বীরত্বের প্রকাশের জন্য নর্তকদের চালচলন এবং মুখোশের ভঙ্গি অত্যন্ত উগ্র ও তেজস্বী করা হয়। এই যে রঙের মনস্তত্ত্ব বা কালার সাইকোলজি যা আধুনিক ডিজাইনাররা আজ ব্যবহার করছেন তা ছৌ শিল্পীরা কয়েকশ বছর আগে থেকেই জানতেন। পৌরাণিক গল্পগুলোর মাধ্যমে এই শিল্প সমাজে সত্যের জয় এবং মন্দের পরাজয়ের বার্তা প্রচার করে যা ছিল তৎকালীন সমাজের এক শক্তিশালী নৈতিক শিক্ষার মাধ্যম।
সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারায় ছৌ নাচ আজ আর কেবল মন্দিরের প্রাঙ্গণে বা গ্রামীণ মেলায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি আজ একটি আন্তর্জাতিক পারফর্মিং আর্ট। কিন্তু এই আধুনিকতার ভিড়ে মুখোশ তৈরির কারিগররা অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রাকৃতিক উপাদানের অভাব এবং শ্রমসাধ্য কাজ হওয়ার কারণে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পেশা থেকে সরে যাচ্ছেন। তবে আশার কথা হলো বিভিন্ন হেরিটেজ সচেতন মানুষ এবং সরকার এই শিল্পের প্রসারে এগিয়ে আসছে। মুখোশ তৈরির এই যে কারিগরি জ্ঞান তা আসলে আমাদের দেশের এক নিজস্ব ইনডিজেনাস টেকনোলজি। মাটি কাগজ কাপড় আর প্রাকৃতিক আঠার সাহায্যে এমন এক ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করা যা একই সাথে শক্ত এবং নমনীয় তা যেকোনো আধুনিক ফ্যাব্রিকেশন ল্যাবরেটরির জন্য একটি শিক্ষার বিষয় হতে পারে।
ছৌ নাচের ছন্দ এবং তালের সাথে মুখোশের ভঙ্গি যখন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় তখন দর্শক এক লৌকিক জগতের বাইরে পৌঁছে যান। এই নাচে কোনো বাদ্যযন্ত্রের বদলে মূলত ধামসা এবং মাদলের গম্ভীর ধ্বনি ব্যবহৃত হয়। শব্দের এই উচ্চ কম্পন বা ফ্রিকোয়েন্সি দর্শক এবং নর্তকের মধ্যে এক ধরনের হাইপনোটিক পরিবেশ তৈরি করে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় অডিটরি স্টিমুলেশন বলা যেতে পারে যা মানুষের অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয় এবং বীরত্বের অনুভূতি জাগ্রত করে। তাই ছৌ নাচ কেবল একটি বিনোদন নয় এটি হলো শারীরিক কসরত শব্দের বিজ্ঞান রঙের রসায়ন এবং পৌরাণিক সাহিত্যের এক মহাসম্মিলন। আমাদের ঐতিহ্যের এই সম্পদকে কেবল দূর থেকে উপভোগ করলে হবে না এর পেছনের এই সূক্ষ্ম কারিগরি এবং ইতিহাসকে বুঝতে হবে। পুরুলিয়ার রুক্ষ মাটির এই শিল্প আজ বিশ্বকে শেখায় কীভাবে সীমিত উপকরণ দিয়েও মহাকাব্যিক উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব। মুখোশের আড়ালের সেই মানুষগুলো যারা দিনরাত এক করে এই অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টিগুলো তৈরি করছেন তাদের শ্রম আর মেধার মূল্যায়ন করাই হবে আমাদের সংস্কৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো। ছৌ নাচের প্রতিটি তালের সাথে মিশে আছে বাঙালির আত্মপরিচয় আর মুখোশের প্রতিটি রেখায় আঁকা আছে আমাদের বীরত্বগাথা। এই ঐতিহ্য চিরকাল অম্লান থাকুক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করুক এটাই আমাদের কাম্য। বিজ্ঞানের যুক্তি আর শিল্পের আবেগ যখন এভাবে হাত ধরাধরি করে চলে তখনই তৈরি হয় ছৌ নাচের মতো এক অমর শিল্পকলা যা সময়ের সীমা ছাড়িয়ে অনন্তকাল টিকে থাকে।



