
শৈশবে নিয়ম মেনে টিকা নেওয়া হয়েছে, তবুও হঠাৎ করে হাম বা মিজলস (Measles) সংক্রমণের খবর শুনে কপালে ভাঁজ পড়ছে অনেকেরই। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অভিভাবকরা আতঙ্কিত—তাহলে কি টিকার কোনো গুণাগুণ নেই? নাকি ভাইরাস নিজের রূপ বদলে ফেলেছে?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য এবং আনন্দবাজারি মেজাজে বিষয়ের গভীরে গিয়ে দেখে নেওয়া যাক টিকা নেওয়ার পরেও কেন হচ্ছে হাম এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের ঠিক কী করা উচিত।
কেন টিকা নেওয়ার পরেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে?
চিকিৎসকদের মতে, হামের টিকা বা MMR (Measles, Mumps, Rubella) ভ্যাকসিন বিশ্বের অন্যতম সফল ও কার্যকর টিকা। তবে এর ‘ফেলিয়র’ বা ব্যর্থতার পিছনে কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ থাকে:
- ভ্যাকসিন এফিকেসি বা কার্যকারিতা: সাধারণত হামের টিকার একটি ডোজ নিলে প্রায় ৯৩% এবং দুটি ডোজ সম্পূর্ণ করলে ৯৭% সুরক্ষা পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ১০০ জনের মধ্যে ৩ জনের শরীরে টিকা নেওয়ার পরেও প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি না-ও হতে পারে। একে বলা হয় ‘প্রাইমারি ভ্যাকসিন ফেইলিওর’।
- ব্রেক-থ্রু ইনফেকশন: অনেক সময় শৈশবে টিকা নেওয়ার পর দীর্ঘ কয়েক দশক অতিক্রান্ত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘সেকেন্ডারি ভ্যাকসিন ফেইলিওর’। এর ফলে সংক্রমণ হলেও তা সাধারণত প্রাণঘাতী হয় না।
- কোল্ড চেইন বজায় না রাখা: টিকা তৈরির কারখানা থেকে ক্লিনিক পর্যন্ত পৌঁছাতে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখতে হয়। যদি কোনো কারণে সেই তাপমাত্রার হেরফের ঘটে, তবে টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
- হার্ড ইমিউনিটির অভাব: যদি কোনো এলাকায় একটি বড় অংশের মানুষ (অন্তত ৯৫%) টিকা না নেন, তবে সেখানে ভাইরাসের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এই প্রবল সংক্রমণের চাপে অনেক সময় টিকা নেওয়া ব্যক্তির শরীরও হার মেনে নিতে পারে।
ভয় কতটা? জটিলতা কি মারাত্মক হতে পারে?
হাম কেবল সাধারণ জ্বর বা গায়ে লাল ফুসকুড়ি নয়। অবহেলা করলে এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যাদের শরীরে আগে থেকেই অন্য কোনো রোগ আছে বা যারা অপুষ্টির শিকার, তাদের জন্য এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
সম্ভাব্য কিছু জটিলতা:
১. নিউমোনিয়া: হামের কারণে ফুসফুসের সংক্রমণ হতে পারে, যা প্রাণঘাতী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ২. এনসেফালাইটিস: এটি মস্তিষ্কের প্রদাহ। খুব কম ক্ষেত্রে হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। ৩. অন্ধত্ব: শরীরে ভিটামিন-এ এর চরম অভাব থাকলে হামের প্রভাবে চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৪. কানের সংক্রমণ: অনেক শিশুর ক্ষেত্রে হামের পর কানে ইনফেকশন বা শোনার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
আগে থেকেই কী কী সতর্কতা নিতে হবে?
হাম একটি অতি সংক্রামক বায়ুবাহিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে প্রায় ১২-১৮ জন সংক্রমিত হতে পারেন। তাই সতর্কতা প্রয়োজন আগে থেকেই।
১. ভ্যাকসিনের ডোজ নিশ্চিত করুন
আপনার বা আপনার সন্তানের টিকার কার্ডটি একবার যাচাই করে নিন। যদি ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুটি ডোজ নেওয়া না হয়ে থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ‘ক্যাচ-আপ’ ভ্যাকসিন দিয়ে দিন। বড়দের ক্ষেত্রেও যদি রেকর্ড না থাকে, তবে একটি বুস্টার ডোজ নেওয়া যেতে পারে।
২. ভিটামিন-এ এর জাদু
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, হাম প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন-এ থাকা।
- খাদ্যতালিকা: নিয়মিত লাল-হলুদ ফল ও সবজি (গাজর, পাকা পেঁপে, মিষ্টি কুমড়ো) এবং সবুজ শাকসবজি খান।
- শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে।
৩. পরিচ্ছন্নতা ও ঘরোয়া সতর্কতা
- আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার করা কাপড়, বাসনপত্র আলাদা রাখুন।
- বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন, কারণ হামের ভাইরাস বাতাসে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে।
- হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন।
৪. উপসর্গ দেখলেই আইসোলেশন
জ্বর, নাক দিয়ে জল পড়া, এবং চোখের লালচে ভাব দেখা দিলে দেরি করবেন না। শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ি বেরোনোর ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি সবথেকে বেশি সংক্রমণ ছড়ান। এই সময় তাকে আলাদা ঘরে রাখা জরুরি।
আমাদের করণীয়
হাম নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে বিজ্ঞানের ওপর ভরসা রাখা জরুরি। মনে রাখবেন, যারা টিকা নিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ হলেও তার তীব্রতা অনেক কম থাকে এবং তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।
আপনার এলাকায় কি সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে? অথবা আপনার বা আপনার শিশুর টিকার রেকর্ড নিয়ে কি কোনো অস্পষ্টতা রয়েছে? সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পুষ্টিকর খাবারই পারে এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করতে।
সতর্কবার্তা: এই নিবন্ধটি সাধারণ সচেতনতার জন্য। আপনার বা আপনার পরিবারের কোনো সদস্যের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না।










