
সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলার আগেই আমাদের হাত চলে যায় স্মার্টফোনের দিকে। ফেসবুকের নোটিফিকেশন, ইনস্টাগ্রামের রিলস কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ চেক না করলে মনে হয় দিনটাই শুরু হয়নি। ঘুমানোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা স্ক্রিনের নীল আলোয় বুঁদ হয়ে থাকি। প্রযুক্তির এই অতি-নির্ভরশীলতা আমাদের অজান্তেই একটি গভীর আসক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ডিজিটাল অ্যাডিকশন’। এই আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে এবং নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে বর্তমানে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ একটি অত্যন্ত জরুরি পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল ডিটক্স মানে প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করা নয়, বরং প্রযুক্তির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রন ফিরে পাওয়া।
ডিজিটাল আসক্তি কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক?
যখন প্রযুক্তি বা সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন কাজ, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক প্রশান্তিতে ব্যাঘাত ঘটায়, তখনই তাকে আসক্তি বলা হয়। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ হরমোন নিঃসৃত হয়। প্রতিটি লাইক, কমেন্ট বা নতুন তথ্য আমাদের সাময়িক আনন্দ দেয়, যা আমাদের বারবার ফোন চেক করতে বাধ্য করে। এই নিরন্তর স্ক্রলিং আমাদের মনোযোগের ক্ষমতা (Attention Span) কমিয়ে দিচ্ছে। আমরা এখন দীর্ঘ সময় কোনো বই পড়তে পারি না বা গভীর কোনো আলোচনায় মনোনিবেশ করতে পারি না। এছাড়া অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, উদ্বেগ বাড়ায় এবং এক ধরণের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে—যেখানে আমরা মানুষের পাশে বসেও ভার্চুয়াল জগতে হারিয়ে থাকি।
ডিজিটাল ডিটক্সের প্রয়োজনীয়তা কেন?
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করলেও এটি আমাদের ব্যক্তিগত সময় এবং চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে। ডিজিটাল ডিটক্স করলে মস্তিস্ক বিশ্রাম পাওয়ার সুযোগ পায়। এটি আমাদের সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে, কারণ আমরা যখন তথ্যের সাগরে ডুবে থাকি না, তখন আমাদের মস্তিস্ক নতুন নতুন চিন্তা করার সুযোগ পায়। এছাড়া এটি আমাদের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর। সারাদিন অন্যের ‘পারফেক্ট’ জীবন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে আমাদের মনে যে অপূর্ণতা বা হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, বিরতি নিলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বাস্তব জীবনের ছোট ছোট আনন্দ—যেমন বৃষ্টি দেখা, প্রিয়জনের সাথে গল্প করা বা প্রকৃতির মাঝে হাঁটা—উপভোগ করার জন্য ডিজিটাল ডিটক্স অপরিহার্য।
কীভাবে শুরু করবেন ডিজিটাল ডিটক্স?
একসাথে সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয় এবং তা করা উচিতও নয়। ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে ডিজিটাল ডিটক্স শুরু করা ভালো। প্রথমত, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। আমরা যখনই ফোনের টুংটাং শব্দ শুনি, তখনই মনোযোগ নষ্ট হয়। কেবল কল এবং জরুরি মেসেজের নোটিফিকেশন চালু রাখুন। দ্বিতীয়ত, দিনে অন্তত এক ঘণ্টা ‘ফোন-ফ্রি’ সময় নির্ধারণ করুন। হতে পারে সেটি সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরের এক ঘণ্টা কিংবা রাতের খাবারের সময়। এই সময়ে ফোন অন্য ঘরে রেখে দিন। তৃতীয়ত, বিছানায় ফোন নেওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন। শোয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে ফোন দূরে সরিয়ে রাখলে ঘুমের মান বহুগুণ বেড়ে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়া বাউন্ডারি বা সীমানা নির্ধারণ
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন। স্মার্টফোনের সেটিংসেই এখন ‘অ্যাপ টাইমার’ থাকে, যা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আপনি কতটা সময় নষ্ট করছেন। ফেসবুক বা ইউটিউবে অন্তহীন স্ক্রলিং না করে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। অনেক সময় আমরা কেবল একঘেয়েমি কাটাতে ফোন হাতে নিই; সেই সময়ে ফোনের বদলে একটি বই পড়া বা ডায়েরি লেখার অভ্যাস করতে পারেন। সপ্তাহের যেকোনো একদিন (যেমন ছুটির দিন) কয়েক ঘণ্টার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। এই ‘অফলাইন’ সময়টি আপনাকে মানসিকভাবে সতেজ করে তুলবে।
বাস্তব সম্পর্কের ওপর জোর দেওয়া
ডিজিটাল ডিটক্সের একটি বড় উদ্দেশ্য হলো মানুষের সাথে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসে ফোন টেবিলে উপুড় করে রাখুন। একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার আনন্দ মেসেঞ্জারের ইমোজির চেয়ে অনেক বেশি। পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানোর সময় ফোন দূরে রাখুন। আপনি যখন ডিজিটাল জগত থেকে বিরতি নেবেন, তখন আপনি আবিষ্কার করবেন যে আপনার চারপাশের পৃথিবীটা অনেক বেশি সুন্দর এবং বৈচিত্র্যময়। শিশুদের সামনে ফোন কম ব্যবহার করুন, কারণ তারা আপনাকে দেখেই শিখছে। প্রকৃত সামাজিকতা আমাদের একাকীত্ব দূর করে যা সোশ্যাল মিডিয়া কখনোই পারে না।
মনোযোগ বাড়ানোর কৌশল
ডিজিটাল ডিটক্সের সময় আপনার হারানো মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে মেডিটেশন বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা করতে পারেন। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কাজ করার অভ্যাস (Deep Work) গড়ে তুলুন। কাজ করার সময় ফোনটি ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোডে রাখুন। আপনি যখন বারবার ফোনের দিকে তাকানো বন্ধ করবেন, তখন আপনার কাজের গতি এবং গুণগত মান অনেক বেড়ে যাবে। প্রকৃতিতে সময় কাটানো ডিজিটাল ডিটক্সের অন্যতম সেরা উপায়। গাছের নিচে বসা বা খোলা আকাশে তাকিয়ে থাকা আমাদের স্নায়ুগুলোকে শান্ত করে। প্রযুক্তিকে দাসে পরিণত করুন, প্রভু হতে দেবেন না।




