দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি পথে টয় ট্রেন: বাষ্পীয় ইঞ্জিনের বাঁশি, নীলগিরি আর হিমালয়ের এক রূপকথার সফর

দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি পথে টয় ট্রেন: বাষ্পীয় ইঞ্জিনের বাঁশি, নীলগিরি আর হিমালয়ের এক রূপকথার সফর

দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি পথে টয় ট্রেন: বাষ্পীয় ইঞ্জিনের বাঁশি, নীলগিরি আর হিমালয়ের এক রূপকথার সফর 2

হিমালয়ের রানী দার্জিলিংয়ের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেঘে ঢাকা পাহাড়, চা বাগান আর আঁকাবাঁকা রেললাইনের ওপর দিয়ে ধীরগতিতে চলা একটি ছোট্ট নীল রঙের ট্রেন। এটিই বিশ্ববিখ্যাত ‘দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে’ বা জনপ্রিয় ‘টয় ট্রেন’। ১৮৮১ সালে শুরু হওয়া এই রেল পরিষেবা আজও কেবল ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলগত বিষ্ময়। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা পাওয়া এই ট্রেনটি পাহাড়ের ২ ফুট চওড়া (ন্য্যারো গেজ) রেললাইন দিয়ে যখন টং-টং করে এগোয়, তখন মনে হয় সময় যেন কয়েক দশক পিছিয়ে গিয়েছে। আজ আমরা এই ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেনের ইতিহাস, এর অনন্য নির্মাণশৈলী এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে এর মায়াবী সফর নিয়ে এক সুদীর্ঘ ও তথ্যবহুল আলোচনায় প্রবেশ করব।

নির্মাণের নেপথ্যে: সিলিগুরি থেকে দার্জিলিংয়ের স্বপ্নযাত্রা

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা যখন দার্জিলিংকে গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলছিল, তখন পাহাড়ের দুর্গম পথে যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। গরুর গাড়ি বা ঘোড়ায় চড়ে এই চড়াই পথ অতিক্রম করতে কয়েক দিন সময় লাগত। এই সমস্যার সমাধান করতে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের এজেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন প্রেস্টেজ এক অভিনব পরিকল্পনা করেন। তিনি প্রস্তাব দেন এমন একটি রেললাইনের, যা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনায়াসে উঠতে পারবে। ১৮৭৯ সালে কাজ শুরু হয়ে মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৮৮১ সালে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপিত হয়। সমতল থেকে শুরু করে ৭০০০ ফুটেরও বেশি উচ্চতায় এই রেললাইন বসানো সেই সময়ের প্রযুক্তিতে ছিল এক অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব।

প্রকৌশলগত জাদু: লুপ এবং জি-জি (Zig-Zags)

দার্জিলিংয়ের পাহাড় এতই খাড়া যে সেখানে সরাসরি রেললাইন বসানো সম্ভব ছিল না। এই বাধা অতিক্রম করতে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা ‘লুপ’ (Loop) এবং ‘জি-জি’ বা রিভার্স পদ্ধতির সাহায্য নেন। পাহাড়ের ধাপে ধাপে ট্রেনটি যখন গোল হয়ে নিজের লেজের দিকে ঘোরে, তাকে বলা হয় লুপ। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘বাতাসিয়া লুপ’, যেখান থেকে তুষারশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং নিচে দার্জিলিং শহরের ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। আবার অনেক জায়গায় ট্রেনটি অনেকটা সময় পিছিয়ে গিয়ে অন্য লাইনে ওঠে, যাকে বলা হয় জি-জি। এই আঁকাবাঁকা পথ ধরেই টয় ট্রেন ধীরলয়ে পাহাড়ের বুক চিরে উপরে উঠে যায়, যা পর্যটকদের জন্য এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

বাষ্পীয় ইঞ্জিন: ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে লুকিয়ে থাকা নস্টালজিয়া

টয় ট্রেনের আসল প্রাণ হলো এর পুরনো দিনের বাষ্পীয় বা স্টিম ইঞ্জিনগুলো। আধুনিক যুগে ডিজেল ইঞ্জিন এলেও পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হলো সেই কয়লার ইঞ্জিনের ঘড়ঘড় শব্দ আর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এই ইঞ্জিনগুলোর নিজস্ব নাম রয়েছে এবং এদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টিংধরিয়াতে একটি বিশেষ ওয়ার্কশপ আছে। ইঞ্জিনের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মীরা যখন হাতে করে বালু লাইনের ওপর ফেলেন (চাকার ঘর্ষণ বাড়ানোর জন্য), তখন মনে পড়ে যায় এই ট্রেনটি পরিচালনার পেছনে কতটা মানবিক শ্রম জড়িয়ে আছে। এই শ্লথ গতিই পর্যটকদের সুযোগ দেয় ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্যকে একদম কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখার।

বাতাসিয়া লুপ এবং ঘুম: উচ্চতার জয়গান

টয় ট্রেনের সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হলো ‘ঘুম’ (Ghum)। এটি ভারতের উচ্চতম এবং বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম রেল স্টেশন (উচ্চতা ৭৪০৭ ফুট)। ঘুমের মিউজিয়ামটিতে টয় ট্রেনের ইতিহাসের নানা দুর্লভ নথি এবং ছবি সংরক্ষিত আছে। ঘুমের ঠিক নিচেই অবস্থিত বাতাসিয়া লুপ, যেখানে বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে ‘ওয়ার মেমোরিয়াল’। ট্রেনের কামরা থেকে যখন বাতাসিয়া লুপের বাগান আর তার মাঝখান দিয়ে ট্রেনটিকে মোড় নিতে দেখা যায়, তখন সেই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করতে ভোলেন না কোনো পর্যটকই। মেঘের আনাগোনা আর পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ট্রেনের বাঁশি এক মায়াবী সুরের মূর্ছনা তৈরি করে।

সংস্কৃতি ও সাহিত্যে টয় ট্রেন

বাংলার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রেও টয় ট্রেনের প্রভাব অপরিসীম। সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ থেকে শুরু করে বলিউডের ‘আরাধনা’ বা ‘বরফি’—টয় ট্রেন বারবার রুপালি পর্দায় রোমান্টিকতার প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছে। সেই বিখ্যাত গান ‘মেরে সপনো কি রানি’ বা ‘কস্তো মাজা হ্যায়’—প্রতিটি সুরে জড়িয়ে আছে এই নীল ট্রেনের ছন্দ। কেবল সিনেমা নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ—বহু মনীষী এই ট্রেনেই চড়ে পাহাড়ের শান্তি খুঁজতে দার্জিলিং গিয়েছেন। টয় ট্রেন কেবল একটি বাহন নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের আবেগের একটি বড় অংশ।

সংকট ও সংরক্ষণের লড়াই

বর্তমানে টয় ট্রেন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পাহাড়ের ধস এবং পুরনো ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশের অভাব এই পরিষেবা বজায় রাখাকে কঠিন করে তুলছে। তবুও ইউনেস্কো এবং ভারত সরকারের উদ্যোগে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। আধুনিক পর্যটকদের জন্য এখন ‘জয় রাইড’ (Joy Ride) চালু হয়েছে, যা দার্জিলিং থেকে ঘুম পর্যন্ত পর্যটকদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। টয় ট্রেনকে টিকিয়ে রাখা মানে কেবল একটি রেল লাইন বাঁচিয়ে রাখা নয়, এটি হলো এক শতাব্দী প্রাচীন শৈল্পিক নির্মাণ এবং পাহাড়ের ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গচ্ছিত রাখা।

উপসংহার ছাড়াই যদি বলি, দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেন হলো হিমালয়ের অলঙ্কার। এই ছোট ট্রেনের কামরায় বসে জানলা দিয়ে যখন পাইন আর সিডার বনের সুবাস ভেসে আসে, আর কুয়াশা এসে জাপ্টে ধরে আপনাকে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা কত সুন্দর। কয়লার সেই গন্ধ আর তীক্ষ্ণ বাঁশি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গতির চেয়ে মন্থরতার মধ্যে কখনও কখনও অনেক বেশি মাধুর্য লুকিয়ে থাকে।

Scroll to Top