
আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা প্রায়ই মনে করি যে সাফল্যের একমাত্র পথ হলো কঠোর পরিশ্রম, আর সেই পরিশ্রম করতে গিয়ে আমরা সবচেয়ে আগে যে জিনিসটি বিসর্জন দিই তা হলো ‘ঘুম’। আমরা গর্ব করে বলি যে আমরা রাতে মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা ঘুমাই। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। ঘুম কেবল বিশ্রামের জন্য নয়, এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি জটিল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। পর্যাপ্ত ঘুম কেন আমাদের কর্মক্ষমতা বাড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যে সাহায্য করে, তা বোঝার জন্য এর বৈজ্ঞানিক দিকগুলো জানা প্রয়োজন।
যখন আমরা ঘুমাই, আমাদের মস্তিষ্ক কিন্তু বসে থাকে না। ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে মস্তিষ্ক সারাদিনের জমানো তথ্যগুলোকে বিন্যস্ত করে। একে বলা হয় ‘মেমোরি কনসোলিডেশন’। আপনি সারাদিনে যা শিখেছেন বা দেখেছেন, তা দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয় ঘুমের সময়। অর্থাৎ, আপনি যদি পর্যাপ্ত না ঘুমান, তবে আপনার শেখার ক্ষমতা এবং মনে রাখার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। যারা সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে চান, তাদের জন্য তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তি এবং দ্রুত শেখার ক্ষমতা অপরিহার্য, যা কেবল ৭-৯ ঘণ্টার গভীর ঘুমের মাধ্যমেই সম্ভব।
ঘুমের অভাব সরাসরি আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা ‘ডিসিশন মেকিং স্কিল’-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশটি আমাদের বিচারবুদ্ধি এবং যুক্তিবাদী চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুমের অভাব হলে এই অংশটি ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ফলে আমরা খিটখিটে হয়ে পড়ি, ভুল সিদ্ধান্ত নিই এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। একজন সফল উদ্যোক্তা বা পেশাজীবীর জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সবচেয়ে বড় গুণ, আর সেই গুণটিই নষ্ট হয়ে যায় ঘুমের অভাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টা না ঘুমানোর পর আমাদের মস্তিষ্কের অবস্থা এমন হয় যা মদ্যপ অবস্থায় থাকার সমান।
কর্মক্ষমতা বা প্রোডাক্টিভিটির সাথে ঘুমের সম্পর্ক সরাসরি। অনেকে ভাবেন বেশি রাত জেগে কাজ করলে বেশি আউটপুট আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ঘুমের অভাবগ্রস্ত একজন মানুষ একটি সাধারণ কাজ করতে যতটা সময় নেন, একজন সতেজ মস্তিষ্কসম্পন্ন মানুষ তার অর্ধেক সময়ে সেই কাজ অনেক বেশি নিখুঁতভাবে করতে পারেন। ঘুমের অভাবে আমাদের ‘রিয়্যাকশন টাইম’ কমে যায়, যা সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে বড় বাধা। সৃজনশীল চিন্তা বা নতুন কোনো আইডিয়া বের করার জন্য মস্তিষ্কের যে নমনীয়তা প্রয়োজন, তা কেবল ঘুমের মাধ্যমেই পুনরুদ্ধার হয়।
শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর ঘুমের প্রভাবও সাফল্যের সাথে যুক্ত। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। একজন অসুস্থ মানুষ কখনো তার ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারেন না। ঘুমের সময় আমাদের শরীর ‘সাইটোকাইনস’ নামক প্রোটিন তৈরি করে যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী রাখে। নিয়মিত ঘুমের অভাব হলে আমাদের শরীর খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং আমরা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ি, যা আমাদের কর্মজীবনে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বললে, ঘুম হলো এক ধরণের ইমোশনাল রেগুলেটর। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে আমাদের মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ (যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে) অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে আমরা তুচ্ছ বিষয়ে রেগে যাই বা বিষণ্ণ বোধ করি। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং লিডারশিপ বজায় রাখার জন্য যে মানসিক ধৈর্য প্রয়োজন, তা ঘুমের অভাবে হারিয়ে যায়। একজন সফল মানুষ কেবল কাজ দিয়েই সফল হন না, তার ব্যবহারের মাধুর্য এবং মানসিক স্থিরতাও তাকে এগিয়ে রাখে।
সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। আপনি যদি আপনার কর্মক্ষমতা বাড়াতে চান, তবে ঘুমের সময়সূচীকে আপনার টু-ডু লিস্টের শীর্ষে রাখুন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। ঘুমের আগে মোবাইল বা ল্যাপটপের নীল আলো থেকে দূরে থাকুন, কারণ এটি মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। মনে রাখবেন, ঘুম কোনো অলসতা নয়; এটি পরবর্তী দিনের যুদ্ধের জন্য আপনার সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি। আপনি যত ভালো ঘুমাবেন, আপনার মস্তিষ্ক তত বেশি ধারালো হবে এবং সাফল্যের পথ তত বেশি সুগম হবে।




