
পুতুল নাচ কেবল শিশুদের বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং এটি মানব সভ্যতার প্রাচীনতম লোকনাট্যের একটি ধারা। বাংলার গ্রামগঞ্জে এক সময় মেলা মানেই ছিল পুতুল নাচের আসর। পর্দার আড়ালে থাকা সুতোর টানে নির্জীব পুতুলগুলো যখন জীবন্ত হয়ে উঠত তখন দর্শক এক মায়াবী জগতে হারিয়ে যেত। কিন্তু আধুনিক আকাশ সংস্কৃতির ভিড়ে এবং ডিজিটাল বিনোদনের জোয়ারে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে। পুতুল নাচের ইতিকথা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এটি কেবল আনন্দ দেওয়ার জন্য ছিল না বরং এর পেছনে ছিল গভীর সামাজিক দর্শন এবং নিপুণ কারিগরি জ্ঞান। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব পুতুল নাচের বিবর্তন এর বৈজ্ঞানিক দিক এবং সমকালীন সমাজে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে।
পুতুল নাচের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন ভারতে বিশেষ করে মহাকাব্য এবং পুরাণেও পুতুল নাচের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে পুতুল নাচের মূলত তিনটি ধারা প্রচলিত আছে—সুতোর পুতুল তারের পুতুল এবং দস্তানা পুতুল। এর মধ্যে সুতোর পুতুল নাচ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং জটিল। একজন দক্ষ পুতুল নাচিয়ে বা সুত্রধর যখন পর্দার আড়ালে থেকে ১০-১২টি সুতোর মাধ্যমে একটি পুতুলের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়ান তখন সেখানে কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানের লিভার এবং পুলি সিস্টেমের এক অদ্ভুত ভারসাম্য। পুতুলের হাতের কবজি ঘাড় এবং কোমরের মোচড় দেওয়ার জন্য সুতোর যে টান বা টেনশন প্রয়োজন তা নিখুঁত না হলে পুতুলটিকে প্রাণবন্ত দেখায় না। এটি আসলে এক ধরনের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং যা আমাদের লোকজ শিল্পীরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় অর্জন করেছেন।
সাংস্কৃতিক দিক থেকে পুতুল নাচ ছিল তৎকালীন সমাজের দর্পণ। প্রাচীনকালে যখন সংবাদপত্রের প্রচলন ছিল না বা সাধারণ মানুষের শিক্ষার হার কম ছিল তখন পুতুল নাচের মাধ্যমেই বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী এবং সামাজিক সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হতো। রামায়ণ মহাভারত থেকে শুরু করে মনসামঙ্গলের কাহিনীগুলো এই নাচের মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠত। মজার বিষয় হলো পুতুল নাচের সংলাপ এবং গানগুলো মূলত লোককবিরাই রচনা করতেন যা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় ছিল। এর ফলে তা খুব দ্রুত মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যেত। পুতুল নাচের মঞ্চ সজ্জা এবং আলোকপাতও ছিল প্রশংসনীয়। মাটির প্রদীপ বা মশালের আলোয় ছায়ার খেলা তৈরি করে এক ধরনের রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করা হতো যা আধুনিক সিনেমার স্পেশাল ইফেক্টের আদি রূপ বলা যেতে পারে।
সামাজিক বিবর্তনের সাথে সাথে পুতুল নাচ কেবল পৌরাণিক কাহিনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় অনেক পুতুল নাচিয়ে রূপকের মাধ্যমে দেশপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দিতেন। আবার স্বাধীনতার পর পরিবার পরিকল্পনা কুসংস্কার দূরীকরণ এবং শিক্ষার গুরুত্ব প্রচারে পুতুল নাচকে একটি শক্তিশালী টুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ মানুষ সোজাসুজি উপদেশের চেয়ে গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করতে বেশি পছন্দ করে। এই যে হিউম্যান সাইকোলজি বা জনশিক্ষা পদ্ধতি তা পুতুল নাচের শিল্পীরা জানতেন। পুতুলের অবয়ব যখন কোনো পরিচিত সামাজিক চরিত্রের আদলে তৈরি করা হতো তখন দর্শক খুব সহজেই তার সাথে একাত্ম হতে পারত।
কিন্তু আজ এই শিল্পের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বিশ্বায়নের যুগে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় মানুষ এখন ঘরের কোণেই সারা বিশ্বের বিনোদন খুঁজে পাচ্ছে। ফলে খোলা মাঠের সেই পুতুল নাচ দেখার ধৈর্য বা সময় মানুষের কমে গেছে। পুতুল নাচের দলগুলোও এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে পেশা পরিবর্তন করে দিনমজুর বা অন্য কোনো কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। এর ফলে একটি জাতির মেধা এবং দীর্ঘদিনের সঞ্চিত লোকজ জ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে। পুতুল তৈরির যে কারিগরি বিশেষ করে কাঠ বা শোলার ওপর রঙের সূক্ষ্ম কাজ তা এক বিশাল আর্ট ফর্ম। পুতুলের পোশাক এবং অলংকার তৈরিতেও যে মেধার প্রয়োজন হয় তা আজ অবহেলিত।
আধুনিক বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে পুতুল নাচকে যদি আমরা নতুনভাবে দেখি তবে একে অ্যানিমেশন বা রোবোটিক্সের আদি পূর্বপুরুষ বলা যেতে পারে। আজকের যুগে আমরা যে স্টপ-মোশন অ্যানিমেশন বা মেকানিক্যাল রোবট দেখি তার মূল ধারণা কিন্তু এই পুতুল নাচের মধ্যেই নিহিত ছিল। পুতুলের প্রতিটি মুভমেন্ট বা নড়াচড়া আসলে ফ্রেম বাই ফ্রেম থট প্রসেসের ফসল। আমরা যদি এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করতে পারতাম তবে হয়তো এটি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতো। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে পুতুল নাচের গল্পগুলোকে যদি ইউটিউব বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে আনা যায় তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুতুল নাচের এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কেবল আবেগের বিষয় নয় এটি আমাদের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যেমন জাপান বা চেক প্রজাতন্ত্রে পুতুল নাচকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা হয় এবং সেখানে এটি একটি সম্মানজনক পেশা। আমাদের দেশেও যদি পুতুল নাচকে একাডেমিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা যায় বা নিয়মিত উৎসবের আয়োজন করা হয় তবে এই শিল্পীরা পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবেন। লোকসংস্কৃতি কোনো স্থির বিষয় নয় এটি বিবর্তনশীল। পুতুল নাচকেও আধুনিক যুগের রুচি অনুযায়ী নতুনভাবে সাজাতে হবে। গানের সুরে এবং গল্পের বিন্যাসে সমসাময়িক বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।
পরিশেষে বলা যায় পুতুল নাচ কেবল নির্জীব কাঠের পুতুল নয় এটি আমাদের শিকড়ের কণ্ঠস্বর। পর্দার আড়ালের সেই সুত্রধর যখন সুতোয় টান দেন তখন যেন তিনি আমাদের ইতিহাসেরই এক একটি অধ্যায়কে জাগিয়ে তোলেন। এই শিল্পের সামাজিক গুরুত্ব আজও শেষ হয়ে যায়নি। মানুষের সাথে মানুষের সরাসরি সংযোগ এবং সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে পুতুল নাচ অতুলনীয়। হারিয়ে যেতে বসা এই লোকশিল্পকে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। আমরা যদি আজ সচেতন না হই তবে হয়তো ভবিষ্যতে পুতুল নাচ কেবল জাদুঘরের কাঁচের ভেতরেই দেখা যাবে বাস্তবের আঙিনায় আর দেখা যাবে না। আমাদের সৃজনশীলতা এবং ঐতিহ্যের এই ধারকটিকে পরম মমতায় আগলে রাখতে হবে যাতে আগামী প্রজন্মও জানতে পারে আমাদের মাটির এই জাদুকরী শিল্পের গল্প। পুতুল নাচের সেই নূপুরের শব্দ আর ঢোলের তাল যেন আমাদের লোকসংস্কৃতির আকাশকে চিরকাল মুখরিত করে রাখে এটাই হোক আমাদের প্রার্থনা।



