
নিজস্ব প্রতিবেদন: উত্তরের হিমশীতল মেরু অঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণের বিস্তীর্ণ বদ্বীপ— সর্বত্র আজ একই কান্নার সুর। প্রকৃতি কি তার ধৈর্যের সীমা হারিয়ে ফেলছে? একুশ শতকের এই মধ্যলগ্নে দাঁড়িয়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন আর কেবল বিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ কোনো শব্দবন্ধ নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তব যা আমাদের অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাত করছে। হিমালয়ের চূড়ায় যে বরফ হাজার বছর ধরে সভ্যতার তৃষ্ণা মিটিয়ে এসেছে, আজ তা গলতে শুরু করেছে অদম্য গতিতে। আর সেই গলিত জল যখন সমুদ্রের বুক ফুঁঁপে তুলছে, তখন সুন্দরবনের মতো হাজারো জনপদ তলিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
শিল্পায়নের অভিশাপ ও উত্তপ্ত ধরিত্রী
আধুনিক বিলাসিতা আর উন্নয়নের উদগ্র বাসনায় মানুষ যে কার্বন নিঃসরণের মহোৎসবে মেতেছে, তার মাসুল দিচ্ছে খোদ ধরিত্রী। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে কলকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের বিষাক্ত বাষ্প আর যথেচ্ছ অরণ্যবিনাশের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের চাদর আরও ঘন হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যদি শিল্পায়নপূর্ব যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়, তবে প্রকৃতিতে এমন এক ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ শুরু হবে যা নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য কোনো আধুনিক প্রযুক্তির থাকবে না। সমকালীন আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা— অসময়ে অতিবৃষ্টি, বিধ্বংসী দাবানল কিংবা হাড়কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহ— আসলে পৃথিবীর শরীরের তীব্র জ্বর। আর এই জ্বরের একমাত্র কারণ হলো মানুষের সীমাহীন ভোগবাদ ও প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের আদিম আকাঙ্ক্ষা।
হিমালয় ও মেরু অঞ্চলের মহাপ্রলয়
পৃথিবীর দুই প্রান্তের বরফ যে কেবল শীতলতার প্রতীক ছিল তা নয়, তারা ছিল পৃথিবীর তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রক। আজ আর্কটিক এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তর যখন আশঙ্কাজনক হারে পাতলা হচ্ছে, তখন সূর্যের তাপ প্রতিফলিত হওয়ার পরিবর্তে সরাসরি সমুদ্র শোষণ করে নিচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এক অন্তহীন চক্র—সমুদ্র উত্তপ্ত হচ্ছে এবং আরও বরফ গলছে। আমাদের ঘরের কাছে হিমালয়ের অবস্থা আরও শোচনীয়। একে বলা হয় পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধুর মতো মহানদীগুলোর উৎস এই হিমবাহগুলো যদি নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে এশিয়ার প্রায় ২০০ কোটি মানুষ চরম জলসংকটে পড়বে। খরার পর আসবে মহামারী, আর মহামারীর পর আসবে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া।
সমুদ্রের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া মানচিত্র
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কেবল উপকূলের মানুষের সমস্যা নয়, এটি এক বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সঙ্কেত। যখন নোনা জল চাষের জমিতে ঢুকে পড়বে, তখন দেখা দেবে চরম খাদ্যসংকট। আর এই সংকট থেকে জন্ম নেবে ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ বা জলবায়ু উদ্বাস্তু। প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ইতিমাজেই মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার অপেক্ষায়। কোটি কোটি মানুষ যখন আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়বে, তখন শুরু হবে সম্পদের অধিকার নিয়ে গৃহযুদ্ধ। অর্থাৎ, পরিবেশের বিপর্যয় শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতায়। আমরা যে উন্নত সভ্যতার বড়াই করি, তা আসলে তাসের ঘরের মতো ঠুনকো যদি না তার ভিত্তি হয় টেকসই উন্নয়ন।
বাস্তুতন্ত্রের বিলুপ্তি ও জীববৈচিত্র্য
জলবায়ু পরিবর্তন কেবল মানুষের শত্রু নয়, এটি লক্ষ লক্ষ প্রজাতির অবলা প্রাণীর মৃত্যুদণ্ড লিখে দিচ্ছে। উত্তর মেরুর শ্বেতভল্লুক থেকে শুরু করে সমুদ্রের প্রবাল প্রাচীর—সবই আজ বিলুপ্তির পথে। বাস্তুতন্ত্রের একটি শিকল ছিঁড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে গোটা প্রাণিজগতে। মৌমাছি যদি পরাগায়ন বন্ধ করে দেয়, তবে মানুষের কৃষি ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে কয়েক বছরেই। অথচ আমরা মত্ত রয়েছি নগরায়নের নেশায়। কংক্রিটের জঙ্গল বাড়ছে, আর কমে যাচ্ছে সেই সবুজ ফুসফুস যা আমাদের প্রাণবায়ু সরবরাহ করে। আমাজন থেকে সুন্দরবন—সবখানেই আজ কুড়ুলের শব্দ।
নবায়নযোগ্য শক্তি ও আগামীর লড়াই
তবে ধ্বংসের এই খতিয়ানের মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে নবায়নযোগ্য শক্তি। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ আর পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার দিকে মানুষ যখন ফিরতে শুরু করেছে, তখন মনে হয় হয়তো এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। বৈদ্যুতিক গাড়ি বা গ্রিন এনার্জির প্রসার আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি যথেষ্ট দ্রুত কাজ করছি? রাষ্ট্রনায়কদের কূটনৈতিক টেবিলে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয় মাটির পৃথিবীতে? প্লাস্টিকের দূষণ থেকে সমুদ্রকে বাঁচানো কিংবা বনাঞ্চল রক্ষা করা— এগুলি এখন আর শৌখিন আন্দোলন নয়, বরং জীবন বাঁচানোর আবশ্যিক শর্ত।
প্রজ্ঞার প্রয়োজন
পরিশেষে, প্রকৃতির এই রোষ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের ফিরতে হবে শিকড়ে। উপনিষদের সেই শান্তিমন্ত্র যেখানে মানুষ ও প্রকৃতিকে এক ও অভিন্ন দেখা হয়েছিল, তার প্রাসঙ্গিকতা আজ সবচেয়ে বেশি। আমরা এই পৃথিবীর মালিক নই, বরং এর রক্ষক মাত্র। আগামীর প্রজন্মের জন্য আমরা কি কেবল এক শুষ্ক ও তপ্ত মরুভূমি রেখে যাব, নাকি রেখে যাব শ্যামল ও সজল এক পৃথিবী— সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। হাতের ঘড়িতে সময় ফুরিয়ে আসছে, আর প্রকৃতির নীরব হুঁশিয়ারি ক্রমশ বজ্রনির্ঘোষে পরিণত হচ্ছে। প্রলয় রুখতে হলে প্রজ্ঞার প্রয়োজন, কেবল বিজ্ঞানের নয়। আমাদের লোভের সমাপ্তিই হতে পারে ধরিত্রীর নতুন করে বেঁচে ওঠার শুরু।










