বংশগতির অলিন্দে অমরত্বের খোঁজ: জিন-সম্পাদনা ও আগামীর অতিমানস

বংশগতির অলিন্দে অমরত্বের খোঁজ: জিন-সম্পাদনা ও আগামীর অতিমানস

বংশগতির অলিন্দে অমরত্বের খোঁজ: জিন-সম্পাদনা ও আগামীর অতিমানস 2

নিজস্ব প্রতিবেদন: ডারউইনের বিবর্তনবাদ কি তবে তার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে? না কি আমরা এমন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছি যেখানে প্রকৃতি নয়, মানুষই নিজের ভাগ্যবিধাতা? গত কয়েক দশকে জীববিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ‘সিআরআইএসপিআর’ (CRISPR) বা জিন-সম্পাদনার এক জাদুকরী কৌশল। আনন্দবাজারের এই বিশেষ নিবন্ধে আমরা আজ তলিয়ে দেখব, ডিএনএ-র অণু-পরমাণুর অলিগলিতে কীভাবে লেখা হচ্ছে আগামীর অতিমানবের ইতিহাস এবং তার নৈতিকতার সংকট।

বিজ্ঞান যখন প্রথম কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকা ডিএনএ-র সর্পিল সিঁড়ির পাঠোদ্ধার করেছিল, তখন মানুষ ভেবেছিল সে জীবনের গোপন সংকেত বুঝে ফেলেছে। কিন্তু আজ সেই সংকেত কেবল পড়া নয়, বরং তা সংশোধন করার ক্ষমতাও আমাদের হাতে। জিন-সম্পাদনা বা ‘জিন এডিটিং’ হলো এক ধরণের আণবিক কাঁচি, যা দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ জিন কেটে বাদ দিয়ে সেখানে সুস্থ জিন প্রতিস্থাপন করা যায়। সমকালীন চিকিৎসাবিজ্ঞানে থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া বা ক্যানসারের মতো বংশগত ও মারণরোগ নির্মূল করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়; বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা যখন রোগমুক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘ডিজাইনার বেবি’ বা কাঙ্ক্ষিত গুণসম্পন্ন সন্তান তৈরির দিকে পা বাড়ায়, তখনই শুরু হয় আসল বিতর্ক।

বিবর্তন ছিল এক ধীরগতির প্রক্রিয়া, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রকৃতি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু আধুনিক জীবপ্রযুক্তি সেই সময়কে সংকুচিত করে এনেছে ল্যাবরেটরির টেস্টটিউবে। বিজ্ঞানীরা এখন ভাবছেন বার্ধক্য জয় করার কথা। কোষের জরা বা বার্ধক্য কেন আসে, তার কারণ লুকিয়ে রয়েছে আমাদের ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকা ‘টেলোমিয়ার’ নামক এক অংশে। যদি জিন-সম্পাদনার মাধ্যমে এই টেলোমিয়ারকে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তবে কি মানুষ অমরত্বের স্বাদ পাবে? সমকালীন জীববিজ্ঞানের এই রোমাঞ্চকর গবেষণা আমাদের একধারে আশাবাদী করে তোলে, অন্যধারে শিউরে দেয়। কারণ, অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা যেমন মানুষের চিরন্তন, তেমনই প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করার পরিণামও হতে পারে ভয়াবহ।

কৃষি ক্ষেত্রেও এই জৈব-বিপ্লব আমূল পরিবর্তন এনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপে যখন বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে, তখন জিন-সম্পাদিত ফসলই হয়ে উঠতে পারে বাঁচার রসদ। কম জলে, অধিক তাপমাত্রায় এবং রোগবালাই ছাড়াই বেড়ে উঠতে সক্ষম এই ফসলগুলো কেবল ফলন বাড়াচ্ছে না, বরং পুষ্টির মানও উন্নত করছে। তবে সমকালীন পরিবেশবাদীদের একাংশ এই ‘জিএমও’ বা জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। তাঁদের মতে, কৃত্রিমভাবে জিনের বদল দীর্ঘমেয়াদে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আর প্রকৃতির সংঘাতের এই দোলাচলেই আজ আমাদের সভ্যতা দণ্ডায়মান।

সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গাটি হলো সামাজিক বৈষম্য। যদি জিন-সম্পাদনা কেবল বিত্তবানদের একচেটিয়া অধিকার হয়ে দাঁড়ায়, তবে সমাজে এমন এক নতুন শ্রেণির উদ্ভব হবে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। একেই বলা হচ্ছে ‘জেনেটিক ইনইকুয়ালিটি’। এক সময় জাতিভেদ বা বর্ণভেদ সমাজকে খণ্ডিত করেছিল, আর ভবিষ্যতে হয়তো ‘জিন-ভেদ’ মানবজাতিকে দুই ভাগে ভাগ করে দেবে— একদল অতিমানস আর অন্যদল প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষ। আনন্দবাজারের এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, বিজ্ঞানের এই অমিত শক্তিকে যদি আমরা বিশ্বজনীন কল্যাণে ব্যবহার না করি, তবে তা বুমেরাং হয়ে আমাদের দিকেই ফিরে আসতে পারে।

পরিশেষে, জীবনের এই রসায়ন নিয়ে খেলা করার আগে আমাদের থামতে হবে এবং ভাবতে হবে। আমরা কি কেবল একটি উন্নত প্রজাতি হতে চাই, না কি আমাদের মানবিকতাকেও রক্ষা করতে চাই? মেধা আর প্রযুক্তির এই দৌড়ে আমরা যদি সহমর্মিতা আর নীতিবোধকে হারিয়ে ফেলি, তবে সেই অগ্রগতি হবে নিছকই আত্মঘাতী। ডিএনএ-র ভাঁজে ভাঁজে আমরা অমরত্বের লিপি লিখতে পারি ঠিকই, কিন্তু সেই অমরত্ব যেন প্রাণের স্পন্দনকে স্তব্ধ না করে দেয়। বিজ্ঞান আমাদের সামর্থ্য দিয়েছে, কিন্তু সেই সামর্থ্যকে ব্যবহারের প্রজ্ঞা দেবে আমাদের ইতিহাস ও মূল্যবোধ। আগামীর পৃথিবী রোবটের নয়, বরং রক্ত-মাংসের মানুষেরই থাকুক— যেখানে জিনের উৎকর্ষের চেয়েও হৃদয়ের টান বেশি মূল্যবান হবে।

Scroll to Top