
বাংলার রাঙামাটির জেলা বাঁকুড়া। এই জেলার এক অতি প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক শহর হলো বিষ্ণুপুর। পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে বিষ্ণুপুর কেবল একটি মহকুমা শহর নয়, বরং এটি বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। পাথরের অভাব যখন বাংলার স্থপতিদের স্থাপত্য নির্মাণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন তাঁরা বাংলার অতি সাধারণ মাটিকেই শিল্পের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন। পোড়ামাটি বা টেরাকোটার সেই অভূতপূর্ব কাজ আজ বিষ্ণুপুরকে বিশ্বদরবারে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
মল্ল রাজবংশের উত্থান ও বিষ্ণুপুরের জন্মকথা
বিষ্ণুপুরের ইতিহাস মল্ল রাজবংশের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। লোকগাঁথা অনুযায়ী, মল্ল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আদি মল্ল ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। তবে রাজবংশের প্রকৃত সমৃদ্ধি শুরু হয় রাজা বীর হাম্বীরের হাত ধরে। মল্ল রাজারা প্রায় এক হাজার বছর ধরে এই অঞ্চল শাসন করেছিলেন। জঙ্গলমহলের এক ছোট রাজ্য থেকে কীভাবে বিষ্ণুপুর শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হলো, তা এক বিস্ময়কর কাহিনী।
রাজা বীর হাম্বীর ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের সমসাময়িক। তিনি শুরুতে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা এবং দস্যু প্রকৃতির ছিলেন। কথিত আছে, বিখ্যাত বৈষ্ণব আচার্য শ্রীনিবাস আচার্য যখন বৃন্দাবন থেকে চৈতন্য চরিতামৃত সহ মূল্যবান পাণ্ডুলিপি নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বীর হাম্বীরের লোকেরা তা লুণ্ঠন করে। কিন্তু পরবর্তীতে শ্রীনিবাস আচার্যের সান্নিধ্যে এসে বীর হাম্বীরের জীবন বদলে যায়। তিনি বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন এবং বিষ্ণুপুরকে ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ হিসেবে গড়ে তোলার শপথ নেন। সেই সময় থেকেই বিষ্ণুপুরে অসংখ্য কৃষ্ণ মন্দির তৈরির সূচনা হয়। মল্ল রাজারা নিজেদের ‘মল্ল’ বা কুস্তিগীর হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন, যার ছাপ পাওয়া যায় এখানকার ‘দলমাদল’ কামানের শক্তি প্রদর্শনীতে।
টেরাকোটা স্থাপত্য: মাটির গায়ে খোদাই করা কবিতা
বিষ্ণুপুরের প্রধান আকর্ষণ হলো এর মন্দির স্থাপত্য। দক্ষিণ ভারতে যেমন বিশাল পাথরের মন্দির দেখা যায়, বাংলায় পাথরের অপ্রতুলতার কারণে স্থপতিরা পোড়ামাটি বা ইটের ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু সাধারণ ইটকে তাঁরা এমনভাবে অলঙ্কৃত করেছিলেন যা আজ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারুকার্য হিসেবে স্বীকৃত।
রাসমঞ্চ: এক অনন্য জ্যামিতিক বিস্ময়
১৬০০ খ্রিস্টাব্দে রাজা বীর হাম্বীর রাসমঞ্চ নির্মাণ করেন। এটি একটি পিরামিড সদৃশ স্থাপত্য যা ল্যাটেরাইট পাথরের ভিত্তিভূমির ওপর নির্মিত। এর গঠনশৈলী পৃথিবীর অন্য কোনো মন্দিরের সাথে মেলে না। এখানে কোনো দেবতাকে স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়নি। বরং সারা বিষ্ণুপুর শহরের সমস্ত রাধা-কৃষ্ণ বিগ্রহকে রাস পূর্ণিমার সময় এখানে আনা হতো। এর ছাদটি ঢালু এবং এর খিলানগুলোতে সূক্ষ্ম অলঙ্করণ রয়েছে। মঞ্চের গঠনশৈলী এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে হাজার হাজার মানুষ দূর থেকে বিগ্রহ দর্শন করতে পারেন।
শ্যামরাই মন্দির: পঞ্চরত্নের কারুকাজ
১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা রঘুনাথ সিংহ শ্যামরাই মন্দির নির্মাণ করেন। এটি একটি ‘পঞ্চরত্ন’ শৈলীর মন্দির, যার অর্থ এর পাঁচটি চূড়া রয়েছে। মন্দিরের দেওয়াল জুড়ে টেরাকোটার যে কাজ রয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। প্রতিটি ইটের ওপর মহাভারত, রামায়ণ এবং কৃষ্ণের রাসলীলার দৃশ্য খোদাই করা। এছাড়া তৎকালীন সমাজের শিকার, যুদ্ধ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চিত্রও এখানে নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। এই মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা ‘রাসচক্র’ পর্যটকদের মূল আকর্ষণ।
জোড়বাংলা মন্দির: বাংলার নিজস্ব দোচালা রীতি
১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মন্দিরটি বাংলার আদি স্থাপত্য রীতির এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এটি দেখতে দুটি জোড়া লাগানো কুঁড়েঘরের মতো। এর দেওয়ালে লঙ্কার যুদ্ধের বর্ণনা এবং কৃষ্ণের নানা লীলা অত্যন্ত জীবন্তভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। জোড়বাংলা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী বুঝিয়ে দেয় যে বাঙালি স্থপতিরা কতটা প্রকৃতিপ্রেমী এবং সৃষ্টিশীল ছিলেন। মন্দিরের কার্নিশগুলোর বাঁকানো নকশা যা ‘চালা’ ঘর থেকে অনুপ্রাণিত, তা এই মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বিষ্ণুপুর ঘরানা: বাংলার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুবতারা
বিষ্ণুপুর কেবল দৃশ্যশিল্পে নয়, শ্রবণশিল্পেও এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে গড়ে ওঠে ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’। এটি বাংলার একমাত্র শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঘরানা যা মূলত ধ্রুপদ গায়কীর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। বাহাদুর খাঁ নামক এক ওস্তাদ যখন মুঘল দরবার ছেড়ে বিষ্ণুপুরে আসেন, তখন থেকেই এই ঘরানার জয়যাত্রা শুরু।
বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীত অত্যন্ত সংযত, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং ভক্তিপ্রধান। এই ঘরানার গান যদুভট্ট, জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী এবং রাধিকা প্রসাদ গোস্বামীর মতো দিকপালদের হাত ধরে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। এমনকি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের ওপরও বিষ্ণুপুর ঘরানার গভীর প্রভাব ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক গানের সুরেও এই ধ্রুপদী প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আজও বিষ্ণুপুরের অলিতে গলিতে সান্ধ্যকালীন আড্ডায় তানপুরার ঝংকার শোনা যায় যা এই প্রাচীন সংস্কৃতির টিকে থাকার প্রমাণ দেয়।
বালুচরী শাড়ি: সিল্কের ভাঁজে পুরাতত্ত্ব
বিষ্ণুপুর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি আপনি বালুচরী শাড়ির কাজ না দেখেন। বালুচরী শাড়ি হলো শিল্পের এক ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী। এই শাড়ির আঁচলে এবং পাড়ে সূক্ষ্ম রেশম সুতোর কাজ দিয়ে মন্দিরের টেরাকোটার মতোই পৌরাণিক কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়। এক একটি শাড়ি তৈরি করতে দক্ষ তাঁতিদের কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগে। স্বর্ণচরী এবং বালুচরী শাড়ি আজ বাংলার কুটির শিল্পের এক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। প্রতিটি সুতোর টানে এখানে জীবন্ত হয়ে ওঠে রামায়ণের অশ্বমেধ যজ্ঞ বা শকুন্তলার বিদায় দৃশ্য।
ডোকরা এবং দলমাদল কামান: বীরত্বের প্রতীক
বিষ্ণুপুরের সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো দলমাদল কামান। ল্যাটেরাইট পাথরের দুর্গের পাশে রাখা এই বিশাল কামানটি মল্ল রাজাদের সামরিক শক্তির পরিচয় দেয়। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, মারাঠা দস্যু বা বর্গীরা যখন বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে, তখন স্বয়ং মদনমোহন (কৃষ্ণ) এই কামান দেগে বর্গীদের বিতাড়িত করেছিলেন।
এছাড়া বিষ্ণুপুরের ‘ডোকরা’ শিল্প বা মোম-ঢালাই পদ্ধতিতে তৈরি ধাতব শিল্প বিশ্বখ্যাত। বাঁকুড়ার ঘোড়া, যা এখন ভারতীয় হস্তশিল্পের লোগো হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তা এই অঞ্চলেরই অবদান। টেরাকোটার ঘোড়া এবং মনসা চালি বিষ্ণুপুরের লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার মৃৎশিল্পীরা বংশপরম্পরায় লাল মাটিকে পুড়িয়ে তৈরি করেন নানা ঘরোয়া সামগ্রী ও ঘর সাজানোর সরঞ্জাম।
পর্যটন এবং আধুনিক বিষ্ণুপুর
বর্তমানে বিষ্ণুপুর পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। শীতকালে এখানে পর্যটকদের ঢল নামে। প্রতি বছর ২৫শে থেকে ৩০শে ডিসেম্বর আয়োজিত হয় ‘বিষ্ণুপুর মেলা’। এই মেলায় স্থানীয় কারিগরদের তৈরি সামগ্রী, বাউল গান এবং বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর বসে। এটি কেবল একটি মেলা নয়, বরং এটি বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এক মিলনমেলা।
ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য কিছু তথ্য:
কিভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে আরণ্যক এক্সপ্রেস, রূপসী বাংলা বা হাওড়া-পুরুলিয়া এক্সপ্রেসে সরাসরি বিষ্ণুপুর যাওয়া যায়। সড়কপথে দুর্গাপুর হয়েও আসা সম্ভব।
কোথায় থাকবেন: পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের ট্যুরিস্ট লজ এবং প্রচুর বেসরকারি হোটেল রয়েছে।
কী খাবেন: বিষ্ণুপুরের বিশেষত্ব হলো এখানকার ‘পোস্ত বড়া’ এবং স্থানীয় বাঙালি থালি। এছাড়া মিষ্টির মধ্যে এখানকার ‘মেচা সন্দেশ’ অত্যন্ত বিখ্যাত।
হেরিটেজ সংরক্ষণের গুরুত্ব
বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলো আজ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই অমূল্য টেরাকোটা কাজগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে। নোনা ধরা এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ইটের কারুকার্য নষ্ট হচ্ছে। আমাদের এই সম্পদ রক্ষা করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, প্রতিটি বাঙালির কর্তব্য। বিষ্ণুপুর আমাদের শেখায় কীভাবে সীমিত সংস্থান দিয়েও বিশ্বজয়ী শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব।
বিষ্ণুপুর কেবল একটি ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি এক অনুভব। এখানকার লাল মাটির গন্ধে, মন্দিরের ঘণ্টার শব্দে এবং বালুচরী শাড়ির বুননে লুকিয়ে আছে বাংলার আত্মা। তাই যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি কাটাতে একবার অন্তত মল্ল রাজাদের এই স্বপ্ননগরীতে পা রাখা উচিত।
