
মঙ্গলে বসতি ও মহাকাশ বিজ্ঞান
কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশন মুভিতে আমরা বহুবার দেখেছি মানুষ পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহে বসবাস করছে। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এটি আর কেবল কল্পনা নয়, বরং এক আসন্ন বাস্তবতা। নাসা (NASA), স্পেস-এক্স (SpaceX) এবং অন্যান্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে মঙ্গলে মানুষের প্রথম কলোনি বা বসতি স্থাপন করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আমরা মঙ্গল গ্রহকে বেছে নিলাম? আর সেখানে টিকে থাকা কি আদৌ সম্ভব?
কেন মঙ্গল গ্রহই শ্রেষ্ঠ বিকল্প?
সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের তুলনায় মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ পৃথিবীর সাথে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুক্র গ্রহের তাপমাত্রা সীসার গলনাঙ্কের চেয়েও বেশি, আর বৃহস্পতি বা শনি গ্রহ মূলত গ্যাসের পিণ্ড। মঙ্গলের একদিন (যাকে ‘সল’ বলা হয়) পৃথিবীর একদিনের চেয়ে মাত্র ৩৯ মিনিট বেশি। এর অক্ষীয় নতি পৃথিবীর মতোই, যার ফলে সেখানে ঋতু পরিবর্তন ঘটে। যদিও মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পাতলা এবং মূলত কার্বন-ডাই-অক্সাইডে পূর্ণ, তবুও সেখানে বরফ আকারে জল পাওয়া গেছে, যা প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
স্পেস-এক্স এবং এলন মাস্কের স্বপ্ন
মঙ্গলে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন এলন মাস্ক। তার প্রতিষ্ঠান স্পেস-এক্স তৈরি করছে ‘স্টারশিপ’ (Starship)—যা এ যাবৎকালে মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট। মাস্কের পরিকল্পনা হলো ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষকে মঙ্গলে পাঠিয়ে সেখানে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর গড়ে তোলা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য প্রয়োজন পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি, যা মহাকাশ ভ্রমণের খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে। স্টারশিপের লক্ষ্য হলো প্রতিবার ১০০ জন যাত্রী এবং প্রচুর রসদ নিয়ে লাল গ্রহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা।
মঙ্গলে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ: অক্সিজেন ও রেডিয়েশন
মঙ্গলে পৌঁছানো যতটা কঠিন, সেখানে টিকে থাকা তার চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং। প্রথম সমস্যা হলো অক্সিজেনের অভাব। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে মাত্র ০.১৬% অক্সিজেন আছে। নাসার ‘পারসিভিয়ারেন্স’ রোভার ইতিমধ্যে ‘মক্সি’ (MOXIE) নামক যন্ত্রের মাধ্যমে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন তৈরির পরীক্ষায় সফল হয়েছে। দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ বা রেডিয়েশন। মঙ্গলের কোনো শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র নেই, তাই সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি সেখানে আছড়ে পড়ে। এর সমাধানে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ঘর তৈরি বা বিশেষ শিল্ড ব্যবহারের কথা ভাবছেন।
খাদ্য ও জলের সংস্থান: স্পেস ফার্মিং
পৃথিবী থেকে সব খাবার নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই মঙ্গলের মাটিতেই চাষাবাদ করতে হবে। মঙ্গলের মাটিতে ক্ষতিকর পারক্লোরেট লবণ থাকলেও বিজ্ঞানীরা তা পরিশোধনের উপায় খুঁজছেন। ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম মাংস এবং বিশেষ গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে আলু বা টমেটো চাষের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে এবং মাটির নিচে জমাট বাঁধা বরফ গলিয়ে পানীয় জলের সংস্থান করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘টেরাফর্মিং’—অর্থাৎ অন্য কোনো গ্রহকে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য করে তোলা।
মঙ্গলে জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্য
দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবী থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে থাকা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মঙ্গলের আকাশ নীল নয়, বরং গোলাপি বা লালচে। সেখানে মহাকর্ষ শক্তি পৃথিবীর মাত্র ৩৮%। অর্থাৎ আপনি পৃথিবীতে যত উচ্চতায় লাফ দিতে পারেন, মঙ্গলে তার তিনগুণ উঁচুতে লাফাতে পারবেন। এই কম মহাকর্ষের কারণে মানুষের হাড় এবং পেশী দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই সেখানে বসবাসকারীদের নিয়মিত বিশেষ ব্যায়াম করতে হবে। একটি নতুন সভ্যতার জন্ম দিতে হলে কেবল প্রযুক্তি নয়, মানুষের ধৈর্য ও সাহসের এক চরম পরীক্ষা হবে এই মিশন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: আমরা কি তৈরি?
২০৩০-এর দশকের শেষের দিকে নাসা মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এটি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযান। মঙ্গলে বসতি স্থাপন কেবল মানুষের কৌতূহল মেটানোর জন্য নয়, বরং পৃথিবীর কোনো বড় বিপর্যয় (যেমন গ্রহাণুর আঘাত বা মহামারী) থেকে মানবজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এটি একটি ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে কাজ করবে। আমরা হয়তো সেই প্রজন্মের অংশ হতে চলেছি যারা প্রথম মহাকাশের অন্য কোনো গ্রহে মানুষের পদচিহ্ন দেখবে।




