
মানসিক প্রশান্তি ও যোগব্যায়াম
একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের জীবন যতটা গতিময় হয়েছে, ঠিক ততটাই বেড়েছে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস। কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাস্তব প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত এক ধরণের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই স্ট্রেস কেবল মনের ওপর নয়, শরীরের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে, যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে এবং শরীরের সাথে মনের সংযোগ স্থাপন করতে ‘যোগব্যায়াম’ বা ইয়োগা বিশ্বজুড়ে এক নির্ভরযোগ্য সমাধান হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
যোগব্যায়াম কী এবং কেন এটি কার্যকর?
যোগব্যায়াম কেবল শরীরের কসরত নয়; এটি একটি জীবনদর্শন যা প্রাচীন ভারতে জন্ম নিলেও আজ আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বারা স্বীকৃত। এটি শ্বাস-প্রশ্বাস (প্রাণায়াম), শারীরিক ভঙ্গি (আসন) এবং মনোযোগের (ধ্যান) একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। যোগব্যায়াম করার সময় আমাদের শরীরে ‘কর্টিসল’ হরমোন (যা স্ট্রেস তৈরি করে) কমে যায় এবং ‘এন্ডোরফিন’ বা সুখের হরমোন নিঃসৃত হয়। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং মস্তিস্ককে বর্তমান মুহূর্তে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে, যা দুশ্চিন্তা দূর করার অন্যতম প্রধান উপায়।
স্ট্রেস কমাতে সহায়ক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসন
মানসিক প্রশান্তির জন্য খুব জটিল আসনের প্রয়োজন নেই। কিছু সহজ আসন প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট চর্চা করলেই উপকার পাওয়া যায়। যেমন ‘শবাসন’—যা শরীরকে সম্পূর্ণ শিথিল করে দেয়। ‘বালাসন’ বা চাইল্ড পোজ মস্তিস্ককে শান্ত করতে এবং পিঠের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া ‘বৃক্ষাসন’ আমাদের শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করতে শেখায়। আপনি যখন একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে স্থির হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে নজর দেন, তখন আপনার বিক্ষিপ্ত মন শান্ত হতে শুরু করে।
প্রাণায়াম: শ্বাস-প্রশ্বাসের জাদুকরী শক্তি
আমরা অধিকাংশ সময় অগভীরভাবে শ্বাস নিই, যা আমাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। যোগব্যায়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রাণায়াম। ‘অনুলোম-বিলোম’ বা ‘ভ্রামরী প্রাণায়াম’ নিয়মিত করলে মস্তিস্কের কোষগুলো সতেজ হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাগ বা উত্তেজনা প্রশমিত হয়। সঠিক পদ্ধতিতে গভীর শ্বাস গ্রহণ করলে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ে এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে সচল ও প্রাণবন্ত রাখে।
যোগব্যায়াম ও উন্নত ঘুম
আধুনিক মানুষের স্ট্রেসের অন্যতম কারণ হলো অনিদ্রা। সারাদিনের কাজের চাপের পর রাতে বিছানায় শুয়েও অনেকের মনে হাজারো চিন্তা ভিড় করে। শোয়ার আগে ৫-১০ মিনিটের সহজ যোগব্যায়াম এবং ধ্যান করলে শরীরের মাংসপেশিগুলো শিথিল হয় এবং স্নায়বিক উত্তেজনা কমে যায়। এটি আপনাকে একটি গভীর এবং নিরবচ্ছিন্ন ঘুম উপহার দিতে পারে, যা পরের দিনের কাজের শক্তি যোগাবে।
দীর্ঘমেয়াদী সুফল এবং জীবনধারার পরিবর্তন
যোগব্যায়াম কেবল একদিনের বিষয় নয়, এটি একটি নিয়মিত অভ্যাস। যারা নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন, তাদের ধৈর্য শক্তি এবং একাগ্রতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি হয়। এটি আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত রাখার ক্ষমতা তৈরি করে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সাথে যোগব্যায়াম যুক্ত করলে বার্ধক্য দেরিতে আসে এবং শরীর রোগমুক্ত থাকে। এটি আপনাকে শেখায় কীভাবে নিজের শরীরকে ভালোবাসতে হয় এবং প্রতিটি মুহূর্তকে সচেতনভাবে উপভোগ করতে হয়।
পরিশেষে, মানসিক প্রশান্তি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ থাকার জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয়তা। আজই আপনার দৈনন্দিন রুটিনে যোগব্যায়ামকে যুক্ত করুন এবং এক নতুন, শান্ত ও ইতিবাচক জীবনের দিকে এগিয়ে যান।




