মানসিক স্বাস্থ্যে সৃজনশীলতার প্রভাব: কেন প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট ছবি আঁকা বা লেখালেখি করা উচিত?

মানসিক স্বাস্থ্যে সৃজনশীলতার প্রভাব: কেন প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট ছবি আঁকা বা লেখালেখি করা উচিত?

আধুনিক সভ্যতার এই যুগে আমরা এক অদ্ভুত যান্ত্রিক জীবন পার করছি। সকালের অ্যালার্ম থেকে শুরু করে রাতের শেষ ইমেল—আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত যেন কোনো এক অদৃশ্য নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই যে অবিরাম ছুটে চলা, এর ফলস্বরূপ আমাদের শরীর যেমন ক্লান্ত হয়, তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত হয় আমাদের মন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মানসিক অবসাদ এবং দুশ্চিন্তা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক মহামারী আকার ধারণ করেছে। কিন্তু এর সমাধান কী? কেবল ওষুধ বা থেরাপি? সম্ভবত না। আমাদের ভেতরেই রয়েছে এক অমোঘ শক্তি, যাকে আমরা বলি ‘সৃজনশীলতা’। সৃজনশীলতা কেবল শিল্পীদের একচেটিয়া অধিকার নয়, এটি প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বের অংশ। প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট সময় যদি আমরা সৃজনশীল কোনো কাজে ব্যয় করতে পারি, তবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কেন সৃজনশীলতা আমাদের মনের জন্য অত্যাবশ্যক এবং কীভাবে এটি আমাদের মস্তিষ্ককে পুনর্গঠিত করে।

সৃজনশীলতা এবং মস্তিষ্কের বিজ্ঞান

সৃজনশীলতা কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোলজিক্যাল গঠন সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা দরকার। যখন আমরা কোনো নতুন কিছু তৈরি করি, যেমন একটি সাদামাটা ছবি আঁকা বা কয়েক লাইন ডায়েরি লেখা, তখন আমাদের মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিউরোসায়েন্টিস্টদের মতে, সৃজনশীল কাজের সময় মস্তিষ্কে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিন ক্ষরিত হয়। এই ডোপামিন হলো এক ধরণের নিউরোট্রান্সমিটার যা আমাদের আনন্দ এবং প্রশান্তি দেয়। একে আমরা ‘ফিল গুড হরমোন’ বলে জানি। যখন আমরা প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট এই চর্চা করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী দুশ্চিন্তা বা অ্যাংজাইটি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়। এটি কেবল সাময়িক আনন্দ দেয় না, বরং মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি বাড়িয়ে নতুন স্নায়বিক সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে, যা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকেও ত্বরান্বিত করে।

আর্ট থেরাপি: রঙের মাধ্যমে মনের জট খোলা

অনেকেই ভাবেন, আমি তো ছবি আঁকতে পারি না, তাহলে ছবি এঁকে আমার লাভ কী? এখানেই আমাদের বড় ভুল। আর্ট থেরাপিতে ছবির গুণমানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় আঁকার প্রক্রিয়ার ওপর। আপনি যখন একটি সাদা কাগজে ইচ্ছেমতো রঙ ঘষেন বা পেন্সিল দিয়ে কোনো আকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন আপনার অবচেতন মনে জমে থাকা অনেক কথা বা আবেগ সেখানে প্রকাশ পায়। একে বলা হয় ‘নন-ভারবাল কমিউনিকেশন’। অনেক সময় আমরা যা মুখে বলতে পারি না বা যে কষ্টের কথা কাউকে বোঝাতে পারি না, তা রঙের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। ১৫ মিনিটের এই আঁকাআঁকি আপনার মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ বা বিষণ্নতাকে বের করে দেওয়ার একটি পথ করে দেয়। এটি আপনার হার্ট রেট কমাতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রঙের কাজ বা স্কেচ করেন, তাদের কর্টিসল লেভেলের উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটে, যা সরাসরি মানসিক শান্তির পথ প্রশস্ত করে।

লেখালেখি এবং জার্নালিং: চিন্তার স্বচ্ছতা

সৃজনশীলতার আরেকটি শক্তিশালী রূপ হলো লেখালেখি। একে বলা হয় ‘এক্সপ্রেসিভ রাইটিং’। যখন আমরা প্রতিদিন আমাদের অনুভূতিগুলো লিখতে শুরু করি, তখন আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে এক ধরণের শৃঙ্খলা ফিরে আসে। সারাদিন আমাদের মাথায় হাজার হাজার চিন্তা ঘোরে, যার বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় বা নেতিবাচক। এই চিন্তার স্রোতকে যখন আমরা কাগজে কলমে নামিয়ে আনি, তখন আমরা আমাদের সমস্যাগুলোকে তৃতীয় ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শিখি। প্রতিদিন ১৫ মিনিট নিজের ডায়েরি লেখা বা জার্নালিং করা আমাদের মেমোরি বা স্মৃতিশক্তি উন্নত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ডায়েরি লেখেন, তাদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে শক্তিশালী হয়। কারণ মন যখন হালকা থাকে, শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তখন ভালোভাবে কাজ করতে পারে। এটি কেবল মনের কথা লেখা নয়, বরং জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কৃতজ্ঞতা বোধ বাড়ানোরও একটি চমৎকার মাধ্যম।

ফ্লো স্টেট: সময়ের ঊর্ধ্বে হারিয়ে যাওয়া

সৃজনশীল কাজের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হলো ‘ফ্লো স্টেট’ (Flow State)। হাঙ্গেরীয় মনস্তত্ত্ববিদ মিহালি সিকজেন্টমিহালি এই ধারণাটি প্রবর্তন করেন। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যখন মানুষ তার কাজে এতটাই মগ্ন হয়ে যায় যে সে সময়ের জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আপনি যখন ১৫ মিনিট পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কোনো নকশা করছেন বা কোনো গল্প লিখছেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক এই ‘ফ্লো স্টেট’-এ প্রবেশ করে। এটি এক ধরণের ধ্যান বা মেডিটেশন। এই অবস্থায় আমাদের ইগো বা ‘আমি’ সত্তাটি কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যায়, ফলে আমরা আত্মসমালোচনা বা হীনমন্যতা থেকে মুক্তি পাই। প্রতিদিন এই অনুভূতি আমাদের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা (Resilience) বাড়িয়ে দেয়, যা জীবনের কঠিন প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সাহায্য করে। এই অবস্থায় মস্তিস্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স সাময়িকভাবে ধীর হয়ে যায়, যা আমাদের দুশ্চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে প্রশান্তি বাড়ায়।

মানসিক অবসাদ রোধে সৃজনশীলতা

বর্তমান বিশ্বে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা একটি নীরব ঘাতক। বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষের মনের আনন্দ কমে যায় এবং তারা জীবনকে অর্থহীন মনে করতে থাকে। সৃজনশীল কাজ মানুষকে একটি নতুন ‘উদ্দেশ্য’ বা পারপাস দেয়। যখন আপনি ছোট একটি কাজ সম্পন্ন করেন, যেমন একটি মাটির পাত্র রঙ করা বা একটি সুন্দর প্যারাগ্রাফ লেখা, তখন আপনার মধ্যে ‘সেন্স অফ অ্যাচিভমেন্ট’ বা কিছু অর্জনের আনন্দ কাজ করে। এই ছোট আনন্দগুলো জমা হয়ে ধীরে ধীরে বড় বিষণ্নতাকে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ১৫ মিনিট নিজেকে সময় দেওয়ার অর্থ হলো—আপনি নিজের গুরুত্ব দিচ্ছেন। নিজেকে ভালোবাসা বা ‘সেলফ লাভ’ শুরু হয় এই ছোট ছোট সৃজনশীল চর্চা থেকেই। এটি একজন ব্যক্তিকে তার নিজের সত্তার সাথে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা হতাশার অন্ধকারে আশার আলো হিসেবে কাজ করে।

কিভাবে শুরু করবেন ১৫ মিনিটের এই অভ্যাস?

সৃজনশীলতা শুরু করার জন্য আপনাকে কোনো আর্ট স্কুল বা লেখক হওয়ার দরকার নেই। আপনার শোবার ঘরের একটি ছোট কোণ বেছে নিন। সাথে রাখুন একটি খাতা এবং কিছু সাধারণ রঙ বা পেন্সিল। আপনার যদি আঁকতে ইচ্ছে না করে তবে হাতের কাছে থাকা পুরোনো ম্যাগাজিন কেটে কোলাজ তৈরি করতে পারেন। অথবা স্রেফ চোখের সামনে যা দেখছেন তা নিয়ে কয়েক লাইন লিখতে পারেন। শুরুটা কঠিন হতে পারে, মনে হতে পারে এগুলো অর্থহীন সময় নষ্ট। কিন্তু টানা ২১ দিন যদি আপনি এই ১৫ মিনিট নিয়ম মেনে চলেন, তবে আপনি নিজেই নিজের মেজাজ বা মুডের পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন। আপনার ঘুমের গভীরতা বাড়বে এবং সারাদিন কাজ করার শক্তি পাবেন। এই অভ্যাসটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করার সময় কমিয়ে দিয়ে আপনাকে আরও উৎপাদনশীল এবং সৃজনশীল করে তুলবে।

Scroll to Top