মুর্শিদাবাদ: হাজারদুয়ারির ছায়া আর নবাবী আমলের অবিনশ্বর ইতিহাস—একটি রাজকীয় সফরনামা এবং বিবর্তনের ইতিকথা

মুর্শিদাবাদ: হাজারদুয়ারির ছায়া আর নবাবী আমলের অবিনশ্বর ইতিহাস—একটি রাজকীয় সফরনামা এবং বিবর্তনের ইতিকথা

মুর্শিদাবাদ: হাজারদুয়ারির ছায়া আর নবাবী আমলের অবিনশ্বর ইতিহাস—একটি রাজকীয় সফরনামা এবং বিবর্তনের ইতিকথা 2

কলকাতার ব্যস্ততা ছাড়িয়ে ভাগীরথী নদীর তীর ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে গেলে পৌঁছে যাওয়া যায় এমন এক শহরে, যেখানে ইতিহাসের প্রতিটি ইট আজও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মুর্শিদাবাদ—বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার স্বপ্নভঙ্গ আর মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী। ১৭০৪ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ যখন ঢাকাকে সরিয়ে এখানে রাজধানী স্থাপন করেন, তখন থেকে পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত এই শহরটি ছিল প্রাচ্যের লন্ডন। আজ আমরা মুর্শিদাবাদের সেই জৌলুসপূর্ণ অতীত, স্থাপত্যের বিস্ময় এবং নবাবী আমলের সংস্কৃতির এক সুদীর্ঘ ও গভীর পর্যালোচনায় প্রবেশ করব, যা আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই জমানায় যখন বাংলার নবাবদের দাপটে কাঁপত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

হাজারদুয়ারি প্রাসাদ: শিল্পের মহাকাব্য এবং মিউজিয়াম

মুর্শিদাবাদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো হাজারদুয়ারি প্রাসাদ। ১৮৩৭ সালে নবাব নাজিম হুমায়ুন ঝায়ের আমলে ব্রিটিশ স্থপতি ডানকান ম্যাকলিওড এটি তৈরি করেন। প্রাসাদের নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর রহস্য—এখানে মোট এক হাজারটি দরজা রয়েছে, যার মধ্যে ৯০০টিই হলো ভুয়া বা নকল। শত্রুদের বিভ্রান্ত করার জন্যই এই অদ্ভুত পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ইতালীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি এই বিশাল প্রাসাদটি বর্তমানে একটি বিশ্বমানের মিউজিয়াম। এখানে রয়েছে নবাবদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, দুষ্প্রাপ্য তৈলচিত্র এবং একটি বিশাল লাইব্রেরি যেখানে হাতে লেখা কয়েকশো বছরের পুরনো কোরআন সংরক্ষিত আছে। প্রাসাদের বিশাল হলঘরে দাঁড়ালে আজও নবাবদের রাজকীয় মেজাজ অনুভব করা যায়।

ইমামবাড়া ও মদিনা মসজিদ: আধ্যাত্মিক আভিজাত্য

হাজারদুয়ারি প্রাসাদের ঠিক বিপরীতেই দাঁড়িয়ে আছে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ইমামবাড়া। ১৮৪৭ সালে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের পর নবাব মনসুর আলী খাঁ এটি পুনরায় নির্মাণ করেন। সাদা রঙের এই বিশাল স্থাপত্যটি মহরমের সময় এক অনন্য রূপ ধারণ করে। ইমামবাড়ার মাঝখানে রয়েছে আদি ‘মদিনা মসজিদ’, যা বাংলার নবাবদের ধর্মীয় আবেগের প্রতীক। এই চত্বরের বিশালত্ব এবং কারুকার্য প্রমাণ করে যে মুর্শিদাবাদ কেবল বাণিজ্যের নয়, আধ্যাত্মিক চর্চারও এক প্রধান কেন্দ্র ছিল। ভাগীরথীর হাওয়ায় যখন ইমামবাড়ার চূড়াগুলো চিকচিক করে ওঠে, তখন এক অপার্থিব প্রশান্তি চারপাশকে গ্রাস করে।

কাটরা মসজিদ: মুর্শিদকুলি খাঁর সমাধি ও শেষ ইচ্ছার নিদর্শন

মুর্শিদাবাদের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য হলো কাটরা মসজিদ। ১৭১৭ সালে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এটি নির্মাণ করেন। এই মসজিদের বিশেষত্ব হলো এর প্রবেশপথের সিঁড়ির নিচে নবাবের সমাধি। তিনি চেয়েছিলেন যাতে পুণ্যার্থীদের পায়ের ধুলো সবসময় তাঁর কবরের ওপর পড়ে—এক চরম বিনয় ও ত্যাগের পরিচয়। মসজিদের চারপাশের বিশাল গম্বুজ আর ধ্বংসাবশেষ আজও সুলতানি আমলের স্থাপত্যের ছাপ বহন করে। যদিও ভূমিকম্পে এর অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও এর রাজকীয় গাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র কমেনি।

খোশবাগ: সিরাজ-উদ-দৌলার শান্ত শয়লান

ভাগীরথী নদীর ওপাড়ে অবস্থিত খোশবাগ বা ‘আনন্দের বাগান’। এটি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সমাধি ক্ষেত্র। এখানে সিরাজ ছাড়াও তাঁর দাদু আলিবর্দী খাঁ এবং স্ত্রী লুৎফুন্নেসা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। পলাশীর প্রান্তরে হারানো সেই বীর নবাবের স্মৃতিতে এই বাগানটি আজও এক বিষণ্ণ নিস্তব্ধতা ধরে রেখেছে। পর্যটকরা যখন এখানে আসেন, তখন সিরাজের বীরত্ব আর ট্র্যাজেডির কথা ভেবে আজও অনেকের চোখ ভিজে ওঠে। খোশবাগের প্রতিটি গাছ আর ফুলের সারি যেন সিরাজের প্রতি এক নীরব শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

জাফরাগঞ্জ দেউড়ি ও নশিপুর রাজবাড়ি

মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের একটি অন্ধকার দিক হলো জাফরাগঞ্জ দেউড়ি বা মীর জাফরের প্রাসাদ। আজ এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে একে ‘নিমক হারাম দেউড়ি’ বলা হয়। কথিত আছে, এই প্রাসাদেই সিরাজ-উদ-দৌলাকে হত্যা করা হয়েছিল। অন্যদিকে রয়েছে নশিপুর রাজবাড়ি, যা দেবী সিংহের প্রাসাদ নামে পরিচিত। ইউরোপীয় স্থাপত্যের ধাঁচে তৈরি এই রাজবাড়িটি তার সুন্দর কারুকার্য আর প্রাচীন সংগ্রহশালার জন্য বিখ্যাত। মুর্শিদাবাদের প্রতিটি রাজবাড়ি আর জমিদার বাড়ি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ব্রিটিশ আমলে এখানকার বিত্তশালীরা কীভাবে ইউরোপীয় সংস্কৃতির সাথে বাংলার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন।

মুর্শিদাবাদি রেশম ও বিখ্যাত হিরে-মুক্তোর কারুকার্য

মুর্শিদাবাদ কেবল স্থাপত্যের জন্য নয়, তার সূক্ষ্ম হস্তশিল্পের জন্যও বিশ্বখ্যাত। এখানকার ‘মুর্শিদাবাদি রেশম’ বা সিল্ক আজও আভিজাত্যের প্রতীক। একসময় মুর্শিদাবাদের মসলিন সারা বিশ্বে রপ্তানি হতো। এছাড়া হাতির দাঁতের কারুকার্য (আইভরি কার্ভিং) এখানকার এক অনন্য শিল্প ছিল। বর্তমানে ভারত সরকার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। মুর্শিদাবাদে ঘুরতে গেলে আপনি এখনও নবাবী আমলের ছোঁয়া পাবেন এখানকার তসর আর বালুচরী শাড়ির নকশায়।

নবাবী রসনা: মুর্শিদাবাদি বিরিয়ানি ও মানতাসা

খাবার ছাড়া মুর্শিদাবাদ সফর অসম্পূর্ণ। এখানকার বিরিয়ানি লখনউ বা কলকাতার চেয়ে আলাদা—অনেক বেশি সুগন্ধি এবং মশলার ব্যবহার অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। এছাড়া এখানকার ‘মুরগি রোস্ট’ এবং বিশেষ ধরনের মিষ্টি ‘মানতাসা’ পর্যটকদের মুখে লেগে থাকে। নবাবদের প্রিয় আম বাগানগুলো থেকে আসা হিমসাগর আর ল্যাংড়া আমের স্বাদ নেওয়ার জন্য গ্রীষ্মকালে এখানে মানুষের ঢল নামে। মুর্শিদাবাদের খাবার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রান্নার মধ্যেও কীভাবে রাজকীয় আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলা যায়।

উপসংহারহীন এই যাত্রায় মুর্শিদাবাদ আমাদের শিখিয়ে দেয় যে সময় বদলে গেলেও ইতিহাস কখনো মরে যায় না। ভাগীরথীর স্রোত আজও বয়ে চলেছে, আর তার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারদুয়ারি বা কাটরা মসজিদ আমাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্ব আর ভুলের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুর্শিদাবাদ কোনো সাধারণ পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি হলো আত্মানুসন্ধানের এক খোলা বই। একবার এখানকার ধুলো গায়ে মাখলে, আপনি বারবার ফিরে আসতে চাইবেন সেই মায়াবী নবাবী জমানায়।

Scroll to Top