যন্ত্র যখন মগজ কেনে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্ত ও বিপন্ন মানবতা

যন্ত্র যখন মগজ কেনে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্ত ও বিপন্ন মানবতা

যন্ত্র যখন মগজ কেনে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্ত ও বিপন্ন মানবতা 2

নিজস্ব প্রতিবেদন: একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকটি সম্ভবত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিবর্তনের সাক্ষী হতে চলেছে। আজ থেকে দু’শো বছর আগে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের চাকা যখন প্রথম ঘুরেছিল, তখন মানুষ ভেবেছিল কায়িক শ্রমের মুক্তি আসন্ন। কিন্তু আজ যখন সিলিকন চিপের ভেতর থেকে ‘কৃত্রিম মেধা’ বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) মানুষের সৃজনশীলতার দুর্গে হানা দিচ্ছে, তখন প্রশ্নটা আর কেবল শ্রমের নয়, অস্তিত্বের। আনন্দবাজারের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা খতিয়ে দেখব, যন্ত্রের এই জয়যাত্রা আমাদের সভ্যতার আদিম সারল্যকে ঠিক কতটা গ্রাস করল।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমকালীন প্রেক্ষাপটে ‘এআই’ এখন আর সায়েন্স ফিকশনের পাতায় বন্দি নেই। চ্যাটবট থেকে শুরু করে চালকহীন গাড়ি— আমাদের যাপনের প্রতিটি রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে অ্যালগরিদমের শাসন। তাত্ত্বিক পরিভাষায় যাকে আমরা ‘মেশিন লার্নিং’ বলছি, তা আসলে মানুষেরই মস্তিষ্কজাত তথ্যের এক বিশাল মহাসমুদ্র। যন্ত্র সেই তথ্য চিবিয়ে খাচ্ছে এবং প্রতি মুহূর্তে নিজেকে আরও শাণিত করছে। কিন্তু এই বিবর্তনের মূল্য কী? প্রখ্যাত বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, আমরা হয়তো অজান্তেই এমন এক ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ তৈরি করছি, যার নিয়ন্ত্রণ অদূর ভবিষ্যতে আমাদের হাতে থাকবে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআই-এর অবদান অনস্বীকার্য। ক্যানসার কোষ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে জটিল অস্ত্রোপচারে রোবোটিক হাতের নিখুঁত ছোঁয়া— সবই বিজ্ঞানের জয়গান গায়। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি বেশ অন্ধকার। যখন একটি যন্ত্র মানুষের মতো কবিতা লেখে বা ছবি আঁকে, তখন অবক্ষয় ঘটে মানুষের সেই চিরন্তন আবেগের, যা কেবল হরমোন আর নিউরনের খেলা নয়।

কর্মসংস্থানের বাজারেও ঘনিয়ে আসছে কালবৈশাখীর মেঘ। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সৃজনশীল পেশা— সর্বত্রই কোপ পড়ার আশঙ্কা। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রূপান্তর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যন্ত্র যদি মানুষের সব কাজ কেড়ে নেয়, তবে সেই উদ্বৃত্ত সময় মানুষ খরচ করবে কোথায়? মেধা কি তবে কেবলই বিনোদনের দাস হয়ে পড়বে? এখানেই উঠে আসছে নৈতিকতা বা ‘এথিক্স’-এর প্রশ্ন। কৃত্রিম মেধার ভেতরে যদি মানুষের মজ্জাগত পক্ষপাত বা ‘বায়াস’ ঢুকে পড়ে, তবে তা সমাজব্যবস্থায় এক ভয়ানক বৈষম্য তৈরি করতে পারে। সমকালীন বিশ্বে ডাটা বা তথ্যই হলো নতুন খনিজ তেল। আর যার হাতে এই তেলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেই হবে আগামীর ঈশ্বর।

তবে আশার আলো যে একেবারে নেই, তা নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাস বলে, প্রযুক্তি সব সময় পুরোনোকে ভেঙে নতুনকে গড়েছে। এআই হয়তো মানুষের একঘেয়ে কাজগুলো সহজ করে দেবে, যাতে মানুষ তার দার্শনিক ও মৌলিক চিন্তার দিগন্তকে আরও প্রসারিত করতে পারে। মহাকাশ গবেষণায় আজ যে অসাধ্য সাধন হচ্ছে, তার নেপথ্যে রয়েছে এই যান্ত্রিক মগজই। ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান বা কৃষ্ণগহ্বরের রহস্যভেদ— সবখানেই আজ অ্যালগরিদমের আধিপত্য। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, যন্ত্রের ধীশক্তি থাকলেও তার ‘প্রজ্ঞা’ নেই। সে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু বোধ বা সহানুভূতি অনুভব করতে পারে না।

পরিশেষে, এই ডিজিটাল মায়ার জগতে দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বকীয়তা বজায় রাখা। যন্ত্রকে আমরা সহকর্মী হিসেবে গ্রহণ করব না কি প্রভু হিসেবে বরণ করব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। বিজ্ঞান আমাদের শক্তি দেয়, কিন্তু বিবেক দেয় ভারসাম্য। আগামীর পৃথিবীতে মেধা আর যান্ত্রিকতার এই দ্বন্দ্বে জয়ী হবে কে, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, সিলিকন চিপের স্পন্দন যদি মানুষের হৃদস্পন্দনকে ছাপিয়ে যায়, তবে সেই সভ্যতা হবে নিছকই এক প্রাণহীন যান্ত্রিক কঙ্কাল। আধুনিক প্রযুক্তির এই মহোৎসবে আমাদের হারানো মানবিকতাকেই যদি খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে এই বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের প্রকৃত সার্থকতা কোথায়?

Scroll to Top