শরীরে জলের গুরুত্ব: কেন কেবল তেষ্টা পেলেই জল খাওয়া যথেষ্ট নয়?

শরীরে জলের গুরুত্ব: কেন কেবল তেষ্টা পেলেই জল খাওয়া যথেষ্ট নয়?

আমাদের শরীরের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই জল। রক্ত, মাংসপেশি, এমনকি হাড়ের ভেতরেও জলের উপস্থিতি বিদ্যমান। আমরা খাবার ছাড়া কয়েক সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারলেও, জল ছাড়া কয়েক দিনের বেশি বেঁচে থাকা অসম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা অনেকেই জল খাওয়ার গুরুত্বকে অবহেলা করি এবং কেবল তখনই জল পান করি যখন আমাদের প্রচণ্ড তেষ্টা পায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, আপনি যখন তেষ্টা অনুভব করছেন, তার মানে হলো আপনার শরীর ইতিমধ্যেই ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ তেষ্টা পাওয়া শরীরের একটি ‘ইমার্জেন্সি কল’। সুস্থ থাকতে হলে আমাদের এই সংকেতের জন্য অপেক্ষা না করে সারাদিন পর্যাপ্ত জল পান করার অভ্যাস করা জরুরি।

কোষীয় কার্যাবলী এবং মেটাবলিজম

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ সঠিকভাবে কাজ করার জন্য জলের ওপর নির্ভরশীল। জল শরীরের ভেতরে পুষ্টি উপাদান এবং অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে। যখন শরীরে জলের অভাব হয়, তখন মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এর ফলে শরীর খাবার থেকে শক্তি উৎপাদন করতে বাধা পায়, যা আমাদের ক্লান্তি এবং অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। পর্যাপ্ত জল পান করলে শরীরের মেটাবলিক রেট বাড়ে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে। যারা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য পর্যাপ্ত জল পান করা একটি অপরিহার্য শর্ত। শরীর যখন হাইড্রেটেড থাকে, তখন এটি টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থগুলো ঘাম এবং মূত্রের মাধ্যমে সহজে বের করে দিতে পারে।

মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও মনোযোগ

অনেকেই হয়তো জানেন না যে, মস্তিষ্কের টিস্যুর প্রায় ৭৫ শতাংশই জল। সামান্যতম জলশূন্যতাও আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১-৩ শতাংশ ডিহাইড্রেশন আমাদের মেজাজ খিটখিটে করে দেয়, মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে ফেলে। সারাদিন মাথা ব্যথা বা ঝিমঝিম করার একটি প্রধান কারণ হতে পারে পর্যাপ্ত জল পান না করা। জল পান করলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে, যা আমাদের দ্রুত চিন্তা করতে এবং সৃজনশীল কাজে মনোযোগী হতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা মানসিক পরিশ্রমের কাজ করেন, তাদের জন্য প্রতি ঘণ্টায় অন্তত এক গ্লাস জল পান করা বুদ্ধিমানের কাজ।

হজম প্রক্রিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ

হজম প্রক্রিয়াকে মসৃণ রাখতে জলের কোনো বিকল্প নেই। আমরা যা খাই, তা হজম করার জন্য পাকস্থলী এবং অন্ত্রে পর্যাপ্ত জলের প্রয়োজন হয়। জল খাবারকে ভেঙে পুষ্টি শোষণে সহায়তা করে। শরীরে জলের অভাব হলে অন্ত্রের চলাচল ধীর হয়ে যায়, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা দেখা দেয়। পর্যাপ্ত জল পান করলে মলাশয় পরিষ্কার থাকে এবং মলত্যাগে কোনো সমস্যা হয় না। এছাড়া এসিডিটি বা বুক জ্বালাপোড়া কমাতেও জল বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত জল খাওয়ার অভ্যাস হজমতন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখে এবং কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

ত্বক ও চুলের উজ্জ্বলতা

দামী কসমেটিকস বা ক্রিম ব্যবহারের চেয়েও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে জল বেশি কার্যকর। ত্বক শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ এবং একে সতেজ রাখতে প্রচুর জলের প্রয়োজন। ডিহাইড্রেশন হলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, চামড়ায় বলিরেখা পড়ে এবং অকাল বার্ধক্যের ছাপ দেখা দেয়। পর্যাপ্ত জল পান করলে ত্বক ভেতর থেকে হাইড্রেটেড থাকে, যা ত্বককে কোমল এবং টানটান রাখে। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে দিয়ে ব্রণ বা ফুসকুড়ি হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয়। ঠিক একইভাবে চুলের গোড়া শক্ত করতে এবং চুলের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতেও জলের গুরুত্ব অপরিসীম। সুস্থ স্ক্যাল্প এবং ঝলমলে চুলের গোপন রহস্য হলো শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা।

শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জয়েন্ট সুরক্ষা

আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে জল ‘থার্মোস্ট্যাট’ হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে গরমের সময় বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় ঘামের মাধ্যমে শরীর অতিরিক্ত তাপ বের করে দেয়, যার জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। এছাড়া আমাদের হাড়ের জয়েন্ট বা সন্ধিস্থলে যে লুব্রিকেন্ট (Synovial fluid) থাকে, তার প্রধান উপাদানই হলো জল। শরীরে জলের অভাব হলে জয়েন্টগুলোতে ঘর্ষণ বাড়ে এবং ব্যথার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘমেয়াদী জয়েন্ট পেইন বা আর্থ্রাইটিসের সমস্যা এড়াতে নিয়মিত পর্যাপ্ত জল পান করা অত্যন্ত জরুরি। এটি কার্টিলেজ বা তরুণাস্থিকে নমনীয় রাখে এবং শরীরের শক-অ্যাবজর্বার হিসেবে কাজ করে।

কিভাবে বুঝবেন আপনি পর্যাপ্ত জল খাচ্ছেন কি না?

আপনার শরীর হাইড্রেটেড কি না তা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মূত্রের রঙ পর্যবেক্ষণ করা। যদি মূত্রের রঙ হালকা হলুদ বা জলের মতো পরিষ্কার হয়, তবে আপনি সঠিক পরিমাণে জল খাচ্ছেন। কিন্তু যদি রঙ গাঢ় হলুদ বা অ্যাম্বার হয়, তবে বুঝতে হবে আপনার শরীর মারাত্মক জলশূন্যতায় ভুগছে। এছাড়া সারাদিন মুখ শুকিয়ে আসা, চামড়া টানটান লাগা বা ঘনঘন খিদে পাওয়াও ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় আমাদের মস্তিস্ক তৃষ্ণাকে ক্ষুধার সাথে গুলিয়ে ফেলে, ফলে আমরা তৃষ্ণা পেলেও খাবার খাই। তাই খিদে পেলে আগে এক গ্লাস জল খেয়ে দেখা উচিত। গড়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস বা ২-৩ লিটার জল পান করা প্রয়োজন, যা ঋতু এবং শারীরিক পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে কমবেশি হতে পারে।

Scroll to Top