
শান্তিনিকেতন: লাল মাটির পথ আর কবিগুরুর স্বপ্নের আঙিনায় একবেলা
কলকাতার ঘিঞ্জি জীবন আর ট্রাফিক জ্যাম থেকে মুক্তি পেতে বাঙালির কাছে শান্তিনিকেতনের চেয়ে ভালো গন্তব্য আর নেই। বীরভূমের এই রাঙামাটির দেশে পা রাখলেই বাতাসের সুরে যেন রবীন্দ্রনাথের গানের ছোঁয়া পাওয়া যায়। শান্তিনিকেতন কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি আদর্শ, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক পরম পীঠস্থান। ১৮৬৩ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করলেও, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে বিশ্বভারতীর রূপ দিয়ে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।
ছাতিমতলা ও উপাসনা গৃহ: স্তব্ধতার মাঝে ঈশ্বর দর্শন
শান্তিনিকেতনে ঢুকলেই প্রথমে মন কাড়ে ‘ছাতিমতলা’। এখানেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ প্রথম ধ্যানে বসেছিলেন এবং অন্তরে শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। আজও এই জায়গার নিস্তব্ধতা আপনার মনের সব কোলাহল শান্ত করে দেবে। এর পাশেই রয়েছে কাঁচের তৈরি অপূর্ব ‘উপাসনা গৃহ’। প্রতি বুধবার ভোরে এখানে বিশেষ প্রার্থনা সভা বসে। বেলজিয়াম গ্লাসের কারুকার্যে তৈরি এই মন্দিরটি যখন সকালের সূর্যের আলোয় ঝলমল করে ওঠে, তখন সে এক অলৌকিক দৃশ্য তৈরি হয়।
উত্তরায়ণ কমপ্লেক্স ও রবীন্দ্র মিউজিয়াম
রবীন্দ্রনাথ যেখানে থাকতেন, সেই উত্তরায়ণ কমপ্লেক্সের পাঁচটি বাড়ি—উদয়ন, কোণার্ক, শ্যামলী, পুনশ্চ এবং উদীচী—স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। প্রতিটি বাড়ির নকশা আলাদা এবং এদের সাথে কবির জীবনের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পাশের ‘বিচিত্রা’ বা রবীন্দ্র মিউজিয়ামে গেলে আপনি কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, পাণ্ডুলিপি এবং তাঁর নোবেল পুরস্কারের প্রতিকৃতি দেখতে পাবেন। ইতিহাস আর শিল্পের এমন সহাবস্থান আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
খোয়াইয়ের হাট: লাল মাটির সোঁদা গন্ধ আর বাউল গান
শান্তিনিকেতন ভ্রমণের পূর্ণতা পায় শনিবারের ‘খোয়াইয়ের সোনাঝুরি হাটে’। খোয়াই নদীর পাশে সোনাঝুরি বনের ছায়ায় যখন স্থানীয় কারিগররা তাদের হাতের তৈরি সামগ্রী নিয়ে বসেন, তখন এক অন্যরকম মেলা জমে ওঠে। একদিকে সাঁওতালি নাচ, অন্যদিকে একতারা হাতে বাউলের গান—এই অভিজ্ঞতা আপনি পৃথিবীর আর কোথাও পাবেন না। শান্তিনিকেতনি চামড়ার ব্যাগ, কাঁথা স্টিচের শাড়ি আর মাটির গয়না কেনার জন্য এটিই শ্রেষ্ঠ জায়গা।
কলাভবন ও ছাতক: শিল্পের উন্মুক্ত পাঠশালা
বিশ্বভারতীর প্রতিটি দেওয়াল যেন এক একটি ক্যানভাস। কলাভবনের দেওয়ালে রামকিঙ্কর বেইজ বা নন্দলাল বসুর ভাস্কর্য দেখে আপনার মনে হবে আপনি কোনো ওপেন-এয়ার গ্যালারিতে হাঁটছেন। খোলামেলা জায়গায় গাছের নিচে ক্লাস নেওয়ার যে প্রথা রবীন্দ্রনাথ চালু করেছিলেন, তা আজও এখানে দৃশ্যমান। প্রকৃতির কোলে বসে শিক্ষার এই পরিবেশই শান্তিনিকেতনকে বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করে রাখে।
কখন যাবেন এবং কী খাবেন?
শান্তিনিকেতন যাওয়ার আদর্শ সময় হলো শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি)। তবে বসন্তকালে ‘বসন্ত উৎসব’ বা পৌষ মাসে ‘পৌষ মেলা’র সময় শান্তিনিকেতন এক উৎসবমুখর রূপ নেয়। খাওয়ার জন্য শান্তিনিকেতনে প্রচুর অপশন আছে। স্থানীয় আদিবাসী থালি থেকে শুরু করে বাঙালি ঘরণার খাবার—সবই পাবেন। বিশেষ করে এখানকার ‘কাষ্টিক’ ও ‘বনবাংলো’র রান্না পর্যটকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়।
শান্তিনিকেতন আপনার জীবনে কী প্রভাব ফেলে?
শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে আসার সময় আপনি কেবল স্মৃতি নিয়ে ফিরবেন না, ফিরবেন এক অন্যরকম প্রশান্তি নিয়ে। কবিগুরুর সেই দর্শন—”আমাদের এই আকাশ, আমাদের এই বাতাস”—আপনার মনে গেঁথে যাবে। কর্মব্যস্ত জীবনে যখন হাঁপিয়ে উঠবেন, তখন লাল মাটির এই টান আপনাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই মাটির কাছে, যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি এক হয়ে মিশে আছে।
পরিশেষে, শান্তিনিকেতন কেবল দেখার জায়গা নয়, এটি অনুভব করার জায়গা। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের এই আঙিনা আমাদের শেখায় কীভাবে শিকড়ের সাথে যুক্ত থেকে বিশ্বকে আপন করে নিতে হয়।


