
মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে শিল্প এবং বিজ্ঞানকে সাধারণত দুটি ভিন্ন মেরু হিসেবে দেখা হয়। আমরা মনে করি শিল্প হলো আবেগ, কল্পনা এবং অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ; অন্যদিকে বিজ্ঞান হলো যুক্তি, প্রমাণ এবং তথ্যের জগত। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, প্রতিটি মহান শিল্পকর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে বিজ্ঞানের কোনো না কোনো নিয়মের ওপর। বিজ্ঞানের সূক্ষ্মতা ছাড়া শিল্পের স্থায়িত্ব অসম্ভব, আবার শিল্পের কল্পনা ছাড়া বিজ্ঞানের অগ্রগতিও অনেক ক্ষেত্রে স্থবির হয়ে পড়ে।
শিল্পের নেপথ্যে বিজ্ঞান: সৃজনশীলতার এক অদৃশ্য সমীকরণ
শিল্পের পেছনে বিজ্ঞানের ভূমিকা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই রঙের রসায়ন নিয়ে আলোচনা করতে হবে। একজন চিত্রশিল্পী যখন তার ক্যানভাসে রঙ ছড়ান, তখন তিনি আসলে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ ঘটান। প্রাচীনকালে যখন কৃত্রিম রঙ আবিষ্কৃত হয়নি, তখন শিল্পীরা প্রাকৃতিক খনিজ, উদ্ভিদ বা প্রাণিজ উৎস থেকে রঙ সংগ্রহ করতেন। যেমন, অতি দামী নীল রঙের জন্য ল্যাপিস লাজুলি পাথর চূর্ণ করা হতো। এই রঞ্জক পদার্থগুলো কীভাবে তেলের সাথে মিশবে বা কীভাবে আলোর উপস্থিতিতে নিজের উজ্জ্বলতা ধরে রাখবে, তা সম্পূর্ণ রসায়নের বিষয়। আধুনিক রসায়ন শিল্পীদের হাতে তুলে দিয়েছে এক্রাইলিক বা সিন্থেটিক রঙের মতো শক্তিশালী মাধ্যম, যা কয়েকশ বছর ধরে অক্ষুণ্ণ থাকে। আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিসরণের নিয়মগুলো না জানলে কোনো শিল্পীই তার ছবিতে আলো-ছায়ার খেলা বা ‘শিয়ারোস্কুরো’ (Chiaroscuro) তৈরি করতে পারতেন না। আমরা যখন কোনো রঙ দেখি, তা আসলে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর প্রতিফলন। লাল রঙ মানে হলো সেই বস্তু দৃশ্যমান আলোর সব তরঙ্গ শোষণ করে কেবল লালের তরঙ্গটি আমাদের চোখে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই জ্ঞান একজন শিল্পীকে রঙের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দর্শককে প্রভাবিত করতে সাহায্য করে।
এরপর আসে গণিত এবং জ্যামিতির কথা। শিল্পের ইতিহাসে রেনেসাঁ যুগ ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বা রাফায়েলের মতো শিল্পীরা জ্যামিতির সূত্র ব্যবহার করে ছবিতে ত্রিমাত্রিক গভীরতা বা ‘পারসপেক্টিভ’ নিয়ে এসেছিলেন। এর আগে মধ্যযুগীয় ছবিগুলো ছিল সমতল। কিন্তু যখন শিল্পীরা ‘ভ্যানিশিং পয়েন্ট’ এবং ‘হরাইজন লাইন’ এর গাণিতিক ধারণাগুলো বুঝলেন, তখন তারা একটি দুই মাত্রার ক্যানভাসে এক বিশাল দালান বা সুদূর দিগন্ত ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হলেন। এখানে বিজ্ঞানের লেন্সের ধারণা এবং মানুষের চোখের দেখার কৌশল কাজ করে। মানুষের চোখ যেভাবে আলোকে গ্রহণ করে এবং মস্তিষ্ক যেভাবে দূরত্ব অনুধাবন করে, সেই জৈবিক প্রক্রিয়াকে শিল্পীরা জ্যামিতির মাধ্যমে অনুকরণ করেন। এছাড়া ‘গোল্ডেন রেশিও’ বা সুবর্ণ অনুপাতের কথা না বললেই নয়। প্রকৃতিতে যেমন ফুলের পাপড়িতে বা শামুকের খোলসে ১.৬১৮ এই বিশেষ অনুপাতটি দেখা যায়, শিল্পীরাও তাদের স্থাপত্য এবং চিত্রকর্মে এই অনুপাত ব্যবহার করেন। তাজমহল থেকে শুরু করে মোনালিসার মুখাবয়ব—সবখানেই এই গাণিতিক সৌন্দর্যের ছোঁয়া রয়েছে। আমাদের মস্তিষ্ক জ্যামিতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ জিনিসকে ‘সুন্দর’ বলে গণ্য করে, যা একটি বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অংশ।
পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্থাপত্যকলা বা ভাস্কর্য হলো মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিরুদ্ধে এক নিরন্তর লড়াই। একটি বিশালাকার মন্দির বা গম্বুজ দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে কাজ করে স্থিতিবিদ্যার (Statics) জটিল সমীকরণ। গ্রিক বা রোমান স্থপতিরা আর্চ বা খিলান তৈরির যে কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন, তা আসলে ওজনকে সমানভাবে বন্টন করে দেওয়ার একটি পদার্থবৈজ্ঞানিক কৌশল। যদি সেই হিসেব ভুল হতো, তবে আজকের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো কয়েক দশকের মধ্যেই ধসে পড়ত। একইভাবে সঙ্গীতশিল্পের কথা বলা যায়। সঙ্গীত হলো মূলত শব্দের কম্পন বা ফ্রিকোয়েন্সি। একটি সেতারের তারে যখন টান দেওয়া হয়, তখন তা বায়ুমণ্ডলে নির্দিষ্ট কম্পন সৃষ্টি করে। কোন স্বরের পর কোন স্বর বসলে তা শুনতে মধুর লাগবে, তা পদার্থবিজ্ঞানের ‘হারমোনিক্স’ এবং ‘অ্যাকুস্টিকস’ দ্বারা নির্ধারিত। মানুষের কান একটি নির্দিষ্ট রেঞ্জের শব্দের কম্পন পছন্দ করে, আর সেই বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে রাগ-রাগিণী বা ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিক।
আধুনিক যুগে এসে শিল্প এবং বিজ্ঞানের এই মিলন আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। নিউরোঅ্যাস্থেটিকস বা স্নায়ু-নান্দনিকতা বিজ্ঞানের একটি নতুন শাখা, যা গবেষণা করে দেখে যে কোনো একটি ছবি বা ভাস্কর্য দেখলে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো কীভাবে কাজ করে। দেখা গেছে, যখন আমরা কোনো বিমূর্ত আর্ট দেখি, আমাদের মস্তিষ্ক সেই হিজিবিজি রেখার মধ্যে একটি অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে, যা মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করে তোলে। ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ ছবিতে যে ধরনের ঘূর্ণাবর্ত দেখা যায়, তা ফ্লুইড ডায়নামিকসের ‘টার্বুলেন্স’ বা অস্থির প্রবাহের গাণিতিক মডেলের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। শিল্পী হয়তো সমীকরণ জানতেন না, কিন্তু তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রকৃতির গাণিতিক সত্যকে ধরে ফেলেছিল।
ফটোগ্রাফি এবং সিনেমার ক্ষেত্রে তো বিজ্ঞানই হলো প্রধান কারিগর। একটি ক্যামেরা লেন্সের মধ্য দিয়ে আলো গিয়ে যখন সেন্সরে পড়ে, তখন সেখানে আলোকবিদ্যার (Optics) জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সিনেমাটোগ্রাফিতে রঙের তাপমাত্রা (Color Temperature) এবং ফ্রেম রেট বজায় রাখা হয় যাতে মানুষের মস্তিষ্ক স্থির ছবিকে গতিশীল বলে ভ্রম পায়। ডিজিটাল যুগে এসে এখন কম্পিউটার গ্রাফিক্স এবং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এমন সব শিল্পকর্ম তৈরি হচ্ছে যাকে ‘জেনারেটিভ আর্ট’ বলা হয়। এখানে শিল্পী কোড লেখেন, আর সেই কোড গাণিতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে একটি অনন্য নকশা তৈরি করে।
সবশেষে বলা যায়, শিল্প এবং বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক। বিজ্ঞান আমাদের দেয় ‘কীভাবে’ (How) তার উত্তর, আর শিল্প দেয় ‘কেন’ (Why) তার উত্তর। বিজ্ঞান ছাড়া শিল্প তার প্রকাশের মাধ্যম হারাবে, আর শিল্প ছাড়া বিজ্ঞান হয়ে পড়বে প্রাণহীন এবং যান্ত্রিক। প্রকৃতির প্রতিটি কোণায় যেমন বিজ্ঞান আছে, সেই বিজ্ঞানকে উপলব্ধি করার এবং উদযাপন করার নামই হলো শিল্প। একজন প্রকৃত শিল্পী সবসময়ই একজন বিজ্ঞানী, কারণ তিনি ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন তার চারপাশের জগতকে বোঝার জন্য। আর একজন বিজ্ঞানীও মনে মনে একজন শিল্পী, কারণ তিনি মহাবিশ্বের জটিল নিয়মের মাঝে এক অনন্য সৌন্দর্য বা ‘এলিগেন্স’ খুঁজে বেড়ান।



