সত্যজিৎ রায়ের গ্রাফিক্স ডিজাইন: সিনেমা ছাড়িয়ে তাঁর ক্যালিগ্রাফি ও টাইপোগ্রাফির জাদুকরী জগত

সত্যজিৎ রায়ের গ্রাফিক্স ডিজাইন: সিনেমা ছাড়িয়ে তাঁর ক্যালিগ্রাফি ও টাইপোগ্রাফির জাদুকরী জগত

সত্যজিৎ রায় বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিশ্ববরেণ্য এক চলচ্চিত্র পরিচালকের ছবি। কিন্তু সিনেমার রঙিন জগতের আড়ালে তাঁর আরও একটি সত্তা ছিল যা সমানভাবে উজ্জ্বল এবং প্রভাবশালী—আর তা হলো তাঁর গ্রাফিক ডিজাইনার সত্তা। সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখা বা পরিচালনার অনেক আগে থেকেই সত্যজিৎ রায় ছিলেন একজন পেশাদার বিজ্ঞাপন শিল্পী এবং ক্যালিগ্রাফার। তাঁর সৃজনশীলতার এই দিকটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা কিছুটা কম হলেও আধুনিক গ্রাফিক ডিজাইনের জগতে সত্যজিৎ রায়ের অবদান অপরিসীম। তিনি কেবল ছবি আঁকতেন না বরং শব্দের আকার এবং বর্ণের বিন্যাস নিয়ে এমন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন যা আজও ডিজাইনারদের কাছে পাঠ্যবইয়ের মতো। সত্যজিৎ রায়ের এই শৈল্পিক যাত্রার মূলে ছিল তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শিল্পের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে তাঁর হাতের জাদুতে বাংলা বর্ণমালা নতুন রূপ পেয়েছিল এবং তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে সিনেমার পোস্টার কীভাবে গ্রাফিক ডিজাইনের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিল।

সত্যজিৎ রায়ের গ্রাফিক জীবনের শুরু হয়েছিল ‘ডি জে কিমার’ নামক একটি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থায়। সেখানে তিনি জুনিয়র ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময়ে বিজ্ঞাপনের জগত ছিল মূলত পাশ্চাত্য ধাঁচের অনুকরণ। কিন্তু সত্যজিৎ রায় সেখানে ভারতীয় এবং বিশেষ করে বাঙালি লোকজ উপাদান ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞাপনের ভাষা বা নকশা যদি সাধারণ মানুষের মাটির কাছাকাছি না হয় তবে তা প্রভাব ফেলতে পারে না। বিজ্ঞাপনের কাজে তাঁর এই মৌলিকতা খুব দ্রুত তাঁকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যায়। এরপর যখন তিনি ‘সিগনেট প্রেস’ এর সাথে যুক্ত হন তখন বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাসের ‘বনলতা সেন’—প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদে তিনি এমন সব নকশা ব্যবহার করেছিলেন যা বইয়ের মূল সুরকে এক নজরেই প্রকাশ করে দিত। তাঁর করা এই প্রচ্ছদগুলো ছিল আধুনিক বিমূর্ত আর্ট এবং ঐতিহ্যবাহী ক্যালিগ্রাফির এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

ক্যালিগ্রাফি বা অক্ষরশিল্পে সত্যজিৎ রায়ের দক্ষতা ছিল কিংবদন্তীতুল্য। বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষরের গঠনকে তিনি নতুনভাবে চিনেছিলেন। তিনি জানতেন যে একটি বর্ণের বাঁক বা তার মাথার মাত্রা কীভাবে একটি সম্পূর্ণ নকশাকে বদলে দিতে পারে। তাঁর নিজের লেখা জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজ ‘ফেলুদা’ এবং বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ‘প্রফেসর শঙ্কু’র বইগুলোর শিরোনাম লক্ষ্য করলে দেখা যায় তিনি প্রতিটি চরিত্রের মেজাজ অনুযায়ী আলাদা আলাদা টাইপোগ্রাফি বা ফন্ট ব্যবহার করতেন। ‘ফেলুদা’র লোগোটি ছিল ধারালো এবং রহস্যময় যা একজন গোয়েন্দার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিকে প্রতিফলিত করে। আবার ‘প্রফেসর শঙ্কু’র ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করতেন একটু বৈজ্ঞানিক এবং ফিউচারিস্টিক ধাঁচের ফন্ট। সত্যজিৎ রায় কেবল হাতের লেখাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি চারটি ইংরেজি ফন্ট তৈরি করেছিলেন যেগুলোর নাম ছিল রায় রোমান, রায় বিজার, ডাফনি এবং হলিডে। এর মধ্যে ‘রায় রোমান’ ফন্টটি আন্তর্জাতিক স্তরে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছিল। একজন বাঙালি শিল্পী হয়ে ইংরেজি টাইপোগ্রাফির জগতে এই ধরনের বৈশ্বিক ছাপ রাখা সত্যিই অভাবনীয়।

সিনেমার ক্ষেত্রেও তাঁর এই গ্রাফিক সেন্স অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ করত। তাঁর সিনেমার শুরুতেই যখন টাইটেল কার্ড বা ক্রেডিট রোল দেখানো হতো তখন সেখানে ফন্টের ব্যবহার ছিল দেখার মতো। যেমন ‘জলসাঘর’ সিনেমার শুরুতে যে রাজকীয় আভিজাত্য বা ‘অশনি সংকেত’ এর শুরুতে দুর্ভিক্ষের যে হাহাকার তা তিনি কেবল ফন্টের আকার দিয়েই বুঝিয়ে দিতেন। এছাড়া তাঁর সিনেমার পোস্টার ডিজাইনগুলো ছিল সল বাস (Saul Bass) এর মতো বিশ্ববিখ্যাত পোস্টার ডিজাইনারদের সমগোত্রীয়। তিনি খুব কম রেখা এবং রঙের ব্যবহারে গভীর অর্থ বহনকারী পোস্টার তৈরি করতে পারতেন। ‘দেবী’ সিনেমার পোস্টারে মুখচ্ছবির যে বিভাজন তিনি দেখিয়েছিলেন তা ছিল সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক দর্শনের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। একজন দক্ষ গ্রাফিক ডিজাইনারের মতো তিনি জানতেন যে পোস্টার কেবল প্রচারের মাধ্যম নয় বরং তা সিনেমার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সত্যজিৎ রায়ের ক্যালিগ্রাফির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর ‘স্পেসিং’ এবং ‘কম্পোজিশন’। তিনি সাদা জায়গাকে (Negative Space) কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা খুব ভালো জানতেন। তাঁর করা নকশাগুলো কখনোই হিজিবিজি ছিল না বরং তা ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং ভারসাম্যপূর্ণ। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিটি ডিজাইনই এক একটি জ্যামিতিক ভারসাম্য রক্ষা করত। তিনি রঙের বৈপরীত্য (Contrast) খুব চমৎকারভাবে ব্যবহার করতেন। সাদা কালো সিনেমার যুগেও তিনি পোস্টারে রঙের যে সঠিক নির্বাচন করতেন তা আজ গবেষণার বিষয়। তাঁর আঁকা ‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রচ্ছদগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় শিশুদের জন্য শিল্প কতটা সহজবোধ্য অথচ উন্নতমানের হতে পারে। সেখানে তিনি বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা এবং ফোক আর্ট ব্যবহার করে ছোটদের এক জাদুকরী জগত উপহার দিয়েছিলেন।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে যেখানে গ্রাফিক ডিজাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে খুব সহজে কাজ করা যায় সেখানে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিটি রেখা ছিল হাতের আঁকা। হাতের টানে তিনি যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতেন তা কোনো যান্ত্রিক সফটওয়্যার দিয়ে সম্ভব নয়। তাঁর ক্যালিগ্রাফি ছিল সুরের মতো। একটি বর্ণের সাথে অন্য বর্ণের যে সংযোগ তা তিনি এমনভাবে মেলাতেন যেন তা এক নিরবচ্ছিন্ন গান। বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে আমরা বিজাতীয় ফন্টের বন্যায় ভেসে যাচ্ছি সেখানে সত্যজিৎ রায়ের তৈরি করা ফন্ট এবং টাইপোগ্রাফি আমাদের শেখায় কীভাবে নিজের ভাষাকে আধুনিকতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে বাংলা বর্ণমালাও ইংরেজি বা লাতিনের মতো সমান স্টাইলিশ এবং বৈশ্বিক হতে পারে।

পরিশেষে বলা যায় সত্যজিৎ রায় কেবল সিনেমার পরিচালক ছিলেন না তিনি ছিলেন এক কালজয়ী ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেটর। তাঁর টাইপোগ্রাফি ক্যালিগ্রাফি এবং গ্রাফিক ডিজাইন আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। আজকের তরুণ ডিজাইনারদের জন্য তিনি এক পরম আদর্শ। তাঁর কাজগুলো প্রমাণ করে যে শিল্প এবং প্রযুক্তির মিলনে কীভাবে অমর সৃষ্টি তৈরি করা যায়। সত্যজিৎ রায়ের গ্রাফিক জগত আমাদের শেখায় কেবল চোখ দিয়ে দেখতে নয় বরং হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে। প্রতিটি অক্ষর প্রতিটি রেখা এবং প্রতিটি রঙের পেছনে যে বিজ্ঞান এবং দর্শন কাজ করে তা তিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তাঁর এই জাদুকরী জগত সিনেমা ছাড়িয়েও আমাদের প্রতিদিনের জীবনে সৌন্দর্যের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের এই বহুমুখী প্রতিভা চিরকাল আমাদের অনুপ্রাণিত করবে এবং তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই গ্রাফিক ডিজাইনের ইতিহাসে এক একটি উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে থাকবে।

Scroll to Top