১০ কোটিরও বেশি কর্মক্ষম ভারতীয় ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র শিকার: সাইলেন্ট কিলার যখন আপনার ঘুম কেড়ে নিচ্ছে

১০ কোটিরও বেশি কর্মক্ষম ভারতীয় ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র শিকার: সাইলেন্ট কিলার যখন আপনার ঘুম কেড়ে নিচ্ছে

১০ কোটিরও বেশি কর্মক্ষম ভারতীয় ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র শিকার: সাইলেন্ট কিলার যখন আপনার ঘুম কেড়ে নিচ্ছে 2

আধুনিক শহুরে জীবনযাত্রায় ক্লান্তি বা অনিদ্রাকে আমরা খুব সাধারণ সমস্যা বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার রাতের নাক ডাকা বা দিনের বেলার প্রচণ্ড ঘুম আসলে এক মরণফাঁদ হতে পারে? সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ১০ কোটিরও বেশি মানুষ ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ (Sleep Apnea) নামক এক জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই আক্রান্তদের একটি বড় অংশই কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্ম।

আনন্দবাজারি ঘরানায় এই সমস্যার গভীরে গিয়ে আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব স্লিপ অ্যাপনিয়ার আদ্যোপান্ত এবং এর প্রতিকারের উপায়।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কী? এটি কেন বিপজ্জনক?

স্লিপ অ্যাপনিয়া কেবল সাধারণ কোনো ঘুমের সমস্যা বা নিছক নাক ডাকা নয়। এটি এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হয়। সহজ কথায়, ঘুমের ঘোরে অজান্তেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য আপনার দম বন্ধ হয়ে যায়। মস্তিষ্ক তখন শরীরকে জাগিয়ে তুলে পুনরায় শ্বাস নিতে বাধ্য করে। এই প্রক্রিয়া সারারাত ধরে কয়েক’শ বার হতে পারে, যার ফলে গভীর ঘুম বা ‘সাউন্ড স্লিপ’ বাধা পায়।

চিকিৎসকদের মতে, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে এটি উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension), টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার ধরন: শরীর যখন সংকেত পাঠায়

আইসিএমআর-এর গবেষণা অনুযায়ী, স্লিপ অ্যাপনিয়া মূলত তিন প্রকারের হতে পারে:

১. অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (OSA): এটি সবচেয়ে সাধারণ। গলার পেশিগুলি শিথিল হয়ে যখন বায়ুপথ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ করে দেয়, তখন এই সমস্যা তৈরি হয়। এর প্রধান লক্ষণ তীব্র নাক ডাকা। ২. সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া: এক্ষেত্রে বায়ুপথ খোলা থাকলেও মস্তিষ্ক শ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী পেশিগুলোকে সঠিক সংকেত পাঠাতে ব্যর্থ হয়। ফলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ৩. কমপ্লেক্স স্লিপ অ্যাপনিয়া: যখন একজন ব্যক্তির মধ্যে ওপরের দুটি সমস্যারই উপস্থিতি দেখা যায়।

কেন তরুণ প্রজন্মই বেশি ভুক্তভোগী?

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কর্মক্ষম ও অল্পবয়সিদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এর পেছনে কাজ করছে মূলত পাঁচটি কারণ:

  • স্থূলতা বা ওবেসিটি: অতিরিক্ত ওজন স্লিপ অ্যাপনিয়ার প্রধান কারণ। ঘাড় ও গলার কাছে অতিরিক্ত মেদ বায়ুপথকে সংকুচিত করে তোলে।
  • অনিয়মিত জীবনযাপন ও ডায়েট: গভীর রাতে জাঙ্ক ফুড খাওয়া, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং ধূমপানের অভ্যাস বায়ুপথে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
  • গ্যাজেট আসক্তি: ঘুমানোর আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল আলো (Blue Light) মস্তিষ্কের স্নায়ুকে উত্তেজিত রাখে, যা স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ নষ্ট করে।
  • নাইট শিফটে কাজ: কর্মক্ষেত্রের চাপে যারা রাত জেগে কাজ করেন, তাদের শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক বিগড়ে যায়। দিনের বেলা ঘুমিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ হয় না, যা ধীরে ধীরে স্লিপ অ্যাপনিয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
  • মানসিক চাপ: দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস বা অ্যাংজাইটি অনিদ্রার সমস্যা তৈরি করে, যা পরে স্লিপ অ্যাপনিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।

উপসর্গ: আপনি কি আক্রান্ত? মিলিয়ে নিন এই লক্ষণগুলো

অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে বুঝতেই পারেন না তিনি এই রোগে ভুগছেন। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি:

  • সঙ্গী বা পরিবারের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড নাক ডাকার অভিযোগ।
  • ঘুমের মধ্যে হঠাৎ দম বন্ধ হয়ে আসা বা হাঁপিয়ে জেগে ওঠা।
  • ঘুম থেকে ওঠার পর তীব্র মাথাব্যথা বা মুখ শুকিয়ে থাকা।
  • সারারাত ঘুমানোর পরেও দিনের বেলা প্রচণ্ড ক্লান্তি ও কাজের মাঝে ঘুম পাওয়া।
  • মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং মনঃসংযোগের অভাব।

প্রতিকারের পথ: জীবনযাত্রায় বদলই কি একমাত্র সমাধান?

স্লিপ অ্যাপনিয়া থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসকরা জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছেন:

১. ওজন নিয়ন্ত্রণ: নিয়মিত ব্যায়াম ও সঠিক ডায়েটের মাধ্যমে শরীরের ওজন কমানো গেলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব। বিশেষ করে গলার মেদ কমলে শ্বাস নেওয়া সহজ হয়।

২. শোয়ার ধরন পরিবর্তন: চিত হয়ে ঘুমানোর চেয়ে পাশ ফিরে ঘুমানোর অভ্যাস করুন। এতে বায়ুপথ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমে।

৩. নেশা ত্যাগ: অ্যালকোহল এবং ঘুমের ওষুধ গলার পেশিকে অতিরিক্ত শিথিল করে দেয়, যা অ্যাপনিয়া বাড়িয়ে তোলে। ধূমপান শ্বাসনালীর প্রদাহ বাড়ায়, তাই এগুলো বর্জন করা শ্রেয়।

৪. সিপ্যাপ (CPAP) থেরাপি: যাদের সমস্যা গুরুতর, তাদের জন্য চিকিৎসকরা ‘কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার’ বা সিপ্যাপ মেশিনের পরামর্শ দেন। এটি ঘুমের সময় একটি মাস্কের মাধ্যমে বায়ুপথে নির্দিষ্ট চাপে বাতাস পাঠিয়ে শ্বাস চলাচল স্বাভাবিক রাখে।

৫. চিকিৎসকের পরামর্শ: যদি সমস্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে দেরি না করে স্লিপ স্টাডি (Polysomnography) করানো প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে ছোট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেও গলার গঠনগত সমস্যার সমাধান করা হয়।

ঘুম আমাদের শরীরের রিচার্জিং পয়েন্ট। কিন্তু অবহেলার কারণে সেই পয়েন্টটিই যদি বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তবে জীবনের গতি স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই নাক ডাকাকে আর পাঁচটা হাসির খোরাক না করে, একে শরীরের সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করুন। সুস্থ জীবন পেতে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে আজই আপনার ঘুমের অভ্যাসের দিকে নজর দিন। মনে রাখবেন, আজকের সচেতনতাই আপনার আগামীর সুস্থ কর্মজীবনের চাবিকাঠি।

Scroll to Top