
নিজস্ব প্রতিবেদন: অন্তহীন মহাকাশের নিস্তব্ধতার গভীরে কান পাতলে কি প্রলয়ের পদধ্বনি শোনা যায়? আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। কোটি কোটি নক্ষত্রের জন্ম আর মৃত্যুর যে মহাজাগতিক খেলা চলছে আমাদের মাথার ওপর, তার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং আতঙ্কিত অধ্যায় হলো ‘কৃষ্ণগহ্বর’ বা ব্ল্যাক হোল। আনন্দবাজারের এই বিশেষ সংখ্যায় আমরা আজ প্রবেশ করব সেই অতল অন্ধকারে, যেখানে সময় থমকে যায় এবং পদার্থবিদ্যার চেনা ছকগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে।
মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণগহ্বর কোনো সাধারণ শূন্যস্থান নয়। এটি হলো মৃত নক্ষত্রের এমন এক কঙ্কাল, যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতটাই প্রবল যে তার কব্জা থেকে আলোও পালাতে পারে না। আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব আজ থেকে এক শতাব্দী আগে এই দানবীয় অস্তিত্বের পূর্বাভাস দিয়েছিল। সমকালীন প্রযুক্তির উৎকর্ষে ২০১৯ সালে ‘ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ’-এর মাধ্যমে আমরা প্রথম সেই অন্ধকারের ছবি দেখেছি। কিন্তু এই ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের এক অনিবার্য সত্য— একদিন সব আলোই হয়তো এই অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাবে।
কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে জন্মায়? যখন একটি বিশালাকার নক্ষত্র তার জ্বালানি শেষ করে ফেলে, তখন তার নিজের ভারেই সে সংকুচিত হতে শুরু করে। এই সংকোচন এমন এক বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছায় যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সিংগুলারিটি’। এখানে ঘনত্ব অসীম এবং আয়তন শূন্য। এই বিন্দুর চারপাশে থাকে একটি অদৃশ্য সীমান্ত, নাম ‘ইভেন্ট হরাইজন’। এই সীমানা অতিক্রম করা মানেই চিরতরে নিখোঁজ হওয়া। স্টিফেন হকিং তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন যে কৃষ্ণগহ্বর পুরোপুরি কালো নয়, সেখান থেকে এক ধরণের সূক্ষ্ম বিকিরণ নির্গত হয়, যা আজ ‘হকিং রেডিয়েশন’ নামে পরিচিত। এর অর্থ হলো, অত্যন্ত ধীর গতিতে হলেও কৃষ্ণগহ্বর বাষ্পীভূত হয় এবং একদিন অদৃশ্য হয়ে যায়।
সমকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো ‘সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল’, যা প্রতিটি ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থান করে। আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ ‘মিল্কি ওয়ে’-র কেন্দ্রেও রয়েছে ‘স্যাজিটেরিয়াস এ-স্টার’ নামক এক দানব। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই কৃষ্ণগহ্বরগুলো কেবল ধ্বংসকারী নয়, বরং ছায়াপথ সৃষ্টিতে এদের এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি হলো ‘বিগ ফ্রিজ’ বা ‘হিট ডেথ’। মহাবিশ্ব যদি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকে, তবে কোটি কোটি বছর পর সব নক্ষত্র নিভে যাবে এবং অবশিষ্ট থাকবে কেবল এই কৃষ্ণগহ্বরগুলো। শেষ পর্যন্ত হকিং বিকিরণের ফলে সেগুলোও মিলিয়ে যাবে এবং পড়ে থাকবে এক অনন্ত, হিমশীতল শূন্যতা।
তবে এই মহাপ্রলয়ের তত্ত্বের সমান্তরালে আরেকটি রোমাঞ্চকর ধারণা ডালপালা মেলছে— ‘ওয়ার্মহোল’। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, কৃষ্ণগহ্বর হয়তো অন্য কোনো মহাবিশ্বের প্রবেশদ্বার। যদি স্থান-কালকে একটি চাদরের মতো মুড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছানোর যে সংক্ষিপ্ত পথ তৈরি হয়, তাই হলো ওয়ার্মহোল। এটি কি কেবলই গণিতের কারসাজি না কি বাস্তব, তা নিয়ে সমকালীন গবেষণাগারগুলোতে চলছে তুমুল বিতর্ক।
পরিশেষে, নক্ষত্রের এই অন্তিম লিপি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের অহংকার এই মহাজাগতিক ক্যানভাসে কতটা তুচ্ছ। আমরা ধুলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র এক গ্রহে বসে সেই শক্তির রহস্যভেদের চেষ্টা করছি, যা খোদ সময়কেও স্তব্ধ করে দিতে পারে। বিজ্ঞান আমাদের অজানাকে জানতে শেখায়, কিন্তু মহাবিশ্বের এই আদিম অন্ধকার আমাদের শেখায় বিনয়। প্রলয় আসবে কি না তা ভবিষ্যতের গর্ভে লুকানো, কিন্তু সেই প্রলয়ের বিজ্ঞান আজ আমাদের অস্তিত্বের সীমানাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। মহাকাশের এই কৃষ্ণবর্ণ গহ্বরগুলো আসলে আয়নার মতো, যেখানে আমরা আমাদের ক্ষুদ্রতা আর অজানাকে জয় করার অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে একসাথে দেখতে পাই।










