বিশ্বায়নের যুগে লোকসংগীত: কীভাবে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বাউল বা ভাটিয়ালি গানের মূল সুর বদলে দিচ্ছে

বিশ্বায়নের যুগে লোকসংগীত: কীভাবে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বাউল বা ভাটিয়ালি গানের মূল সুর বদলে দিচ্ছে

বাঙালির প্রাণের স্পন্দন লুকিয়ে আছে তার লোকসংগীতে। মাঠ-ঘাট-প্রান্তরের গান বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া বা জারি-সারি গানগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং এগুলো আমাদের হাজার বছরের জীবনদর্শন এবং মাটির সুবাস বয়ে বেড়ায়। তবে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের প্রাবল্যে এই আদি লোকসংগীত আজ এক বিরাট পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের অনুপ্রবেশে লোকসংগীতের সেই আদি সুর বা মেঠো আমেজ আজ অনেকটাই বদলে গেছে। এই পরিবর্তনকে কেউ দেখছেন বিবর্তন হিসেবে, আবার কারোর মতে এটি লোকজ সুরের বিকৃতি। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে বিশ্বায়ন এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার আমাদের লোকসংগীতের ডিএনএ বদলে দিচ্ছে এবং এর নেপথ্যে থাকা সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কারণগুলো কী কী।

লোকসংগীতের মূল শক্তি হলো তার সারল্য। আগে একজন বাউল যখন একতারা হাতে গান ধরতেন, তখন সেই একতারার একটি মাত্র তারের গুঞ্জন আর হাতের ডুবকির তালের মধ্যেই সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সুর ধরা পড়ত। ভাটিয়ালি গানের দীর্ঘ তান যখন মাঝির কণ্ঠে নদীর বুকে প্রতিধ্বনিত হতো, তখন সেখানে কোনো ড্রামস বা বেস গিটারের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে আজ লোকসংগীত কেবল গ্রামের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পৌঁছে গেছে স্টুডিওর চার দেয়ালের ভেতরে। আধুনিক স্টুডিও রেকর্ডিংয়ে যখন একটি বাউল গানকে ‘ফিউশন’ করা হচ্ছে, তখন সেখানে সিন্থেসাইজার, ইলেকট্রিক গিটার এবং অক্টোপ্যাডের মতো বাদ্যযন্ত্র যোগ করা হচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় শব্দ হলো কম্পন। একতারা বা দোতারার মতো প্রাকৃতিক তন্তুর বাদ্যযন্ত্র যে কম্পন (Frequency) তৈরি করে, ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ডিজিটাল তরঙ্গ তার থেকে একদম আলাদা। ফলে গানের সেই হাড়কাঁপানো মেঠো সুরটি যখন স্পিকারে বাজছে, তখন তা অনেক বেশি যান্ত্রিক এবং চকচকে শোনাচ্ছে।

আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হচ্ছে তা হলো গানের ‘আকাস্টিক ইকো-সিস্টেম’ নষ্ট হওয়া। লোকসংগীতের সুরগুলো মূলত প্রকৃতির শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে তৈরি হয়েছে। ভাটিয়ালি গানের সুরের মধ্যে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ বা নদীর ঢেউয়ের যে ছন্দ থাকে, তা আধুনিক ড্রামসের হাই-টেম্পো বিটের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। গানের তাল বা লয় এখন অনেক দ্রুত হয়ে গেছে। লোকসংগীত যেখানে ছিল ধীরস্থির এবং চিন্তাশীল, সেখানে বিশ্বায়নের যুগে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে নাচ বা উন্মাদনার মাধ্যম। পাশ্চাত্য মিউজিক থিওরির ‘টেম্পো’ আর আমাদের লোকজ ‘ছন্দ’ এক নয়। যখন জোর করে বাউল গানের ওপর ৪/৪ বিটের ওয়েস্টার্ন ড্রাম প্যাটার্ন বসানো হয়, তখন গানের আধ্যাত্মিক ভাবধারাটি নষ্ট হয়ে কেবল চটকদার সুরে পরিণত হয়। এটি হলো সংস্কৃতির এক ধরনের হাইব্রিডাইজেশন, যেখানে মূল শিকড়টি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবে বিশ্বায়নের কেবল নেতিবাচক দিকই নেই। এর ফলে লোকসংগীত আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হচ্ছে। কোক স্টুডিওর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে যখন লোকজ সুরকে ফিউশন করা হয়, তখন তা বিশ্বজুড়ে কয়েক কোটি শ্রোতার কাছে পৌঁছায়। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যারা হয়তো একতারা কী তা জানত না, তারা আজ গিটারে বাউল গানের সুর তুলছে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার দাম দিতে হচ্ছে গানের মৌলিকতাকে। বাণিজ্যিকভাবে সফল করার জন্য গানের লিরিক বা সুরকে অনেক সময় সহজ ও পপ-ধর্মী করা হয়। একে মিউজিকোলজির ভাষায় বলা হয় ‘পপ-উলাইজেশন অফ ফোক মিউজিক’। এর ফলে গানের সেই আদি গভীরতা যা মূলত মরমী সাধকদের সাধনার ফসল ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লোকসংগীতের পরিবেশ ও পরিবেশনার পরিবর্তন। আগে লোকসংগীত ছিল উন্মুক্ত প্রান্তরে, যেখানে শব্দের কোনো প্রতিফলন (Reverberation) হতো না। খোলা আকাশের নিচে গানের সুর ছড়িয়ে পড়ত এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। আজ সেই গান যখন বদ্ধ এসি হলঘরে লাউড স্পিকারের মাধ্যমে বাজানো হয়, তখন শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি কানে অনেক বেশি আঘাত করে। আধুনিক মাইক্রোফোন গানের সূক্ষ্ম কারুকাজগুলো হয়তো ধরতে পারে, কিন্তু শিল্পীর সেই দীর্ঘশ্বাসের যে আবেগ মাঠের ধারে বসে অনুভব করা যেত, তা যান্ত্রিক মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বাদ্যযন্ত্রের এই আধুনিকায়ন আসলে আমাদের শোনার ধরণকেও বদলে দিয়েছে। আমরা এখন ভারী বেস বা বিট ছাড়া গান শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, যার ফলে দোতারা বা খমকের সেই সূক্ষ্ম মিড়গুলো আমাদের কানে আর আগের মতো ধরা দেয় না।

সামাজিক বিবর্তনও এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে। এখনকার বাউল বা লোকশিল্পীরাও বিশ্বায়নের বাইরে নন। তারাও ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যান্য দেশের গান শুনছেন। ফলে তাদের অবচেতন মনেও পাশ্চাত্য সুরের প্রভাব পড়ছে। তারা এখন স্টেজ পারফরম্যান্সের জন্য আধুনিক কিবোর্ড বা প্যাড ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন কারণ শ্রোতারা এখন অনেক বেশি শব্দ পছন্দ করেন। এই যে রুচির পরিবর্তন, তা আসলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের ফল। আমরা যখন ভাবি যে ড্রামস বা গিটার ছাড়া গান জমানো সম্ভব নয়, তখনই আমরা আমাদের আদি বাদ্যযন্ত্রগুলোর সক্ষমতাকে অস্বীকার করি। অথচ দোতারা দিয়ে যে কোনো আধুনিক সুর তোলা সম্ভব, তা অনেক সময় আমরা ভুলেই যাই।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়ন এক অনিবার্য বাস্তবতা। একে অস্বীকার করার উপায় নেই। লোকসংগীতের এই বিবর্তন বা আধুনিকায়ন সময়ের প্রয়োজনে ঘটছে। কিন্তু আমাদের সচেতন থাকতে হবে যাতে আধুনিক যন্ত্রের আস্ফালনে লোকসংগীতের সেই ‘মরমী আত্মা’ হারিয়ে না যায়। বাদ্যযন্ত্র কেবল একটি মাধ্যম, মূল জিনিস হলো সুর এবং তার পেছনের আবেগ। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেও যদি বাউল গানের সেই নিগূঢ় তত্ত্ব বা ভাটিয়ালির একাকীত্বের সুর বজায় রাখা যায়, তবেই তা হবে সার্থক ফিউশন। অন্যথায় আমরা কেবল এক হাইব্রিড সুরের অধিকারী হব, যার কোনো শিকড় থাকবে না। লোকসংগীত হলো মাটির টান, একে মহাকাশের কৃত্রিম শব্দের সাথে মেলাতে গেলে মাটির স্পর্শ যেন আমরা না হারাই—সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির সুফলকে গ্রহণ করে আমাদের আদি সুরকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার সাথে টিকিয়ে রাখাই হোক আমাদের আগামীর লক্ষ্য। শিল্পের নেপথ্যে যে বিজ্ঞান থাকে, সেই বিজ্ঞানকে আমাদের ব্যবহার করতে হবে ঐতিহ্যের সুরক্ষায়, সুরের বিকৃতিতে নয়।

Scroll to Top