সাইবার নিরাপত্তা: ইন্টারনেটের অন্ধকার জগত থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে রক্ষার উপায়

সাইবার নিরাপত্তা: ইন্টারনেটের অন্ধকার জগত থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে রক্ষার উপায়

আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে আমাদের জীবনের অধিকাংশ কর্মকাণ্ডই ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। কেনাকাটা, ব্যাংকিং, যোগাযোগ থেকে শুরু করে বিনোদন—সবই এখন ডিজিটাল। কিন্তু এই ডিজিটাল আশীর্বাদের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি। হ্যাকিং, ফিশিং, পরিচয় চুরি (Identity Theft) এবং অনলাইন বুলিংয়ের মতো ঘটনা এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। সাইবার অপরাধীরা কেবল বড় বড় প্রতিষ্ঠানেই হানা দেয় না, বরং সাধারণ মানুষ এবং তাদের পরিবারও এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। তাই ইন্টারনেটের এই বিশাল সমুদ্রে নিরাপদে চলাচল করার জন্য সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে জানা এখন বিলাসিতা নয়, বরং একটি মৌলিক প্রয়োজন।

পাসওয়ার্ডের নিরাপত্তা: আপনার প্রথম প্রতিরক্ষা দেওয়াল

অধিকাংশ সাইবার হামলার মূলে থাকে দুর্বল পাসওয়ার্ড। আমরা প্রায়ই সহজ মনে রাখার জন্য ‘123456’ বা নিজের নাম ও জন্মসাল পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করি, যা হ্যাকারদের জন্য পানির মতো সহজ। একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড হতে হবে অন্তত ১২-১৬ অক্ষরের, যেখানে বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্নের সংমিশ্রণ থাকবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা। যদি আপনি সব জায়গায় একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন এবং একটি সাইট হ্যাক হয়, তবে আপনার সব অ্যাকাউন্ট ঝুঁকিতে পড়বে। এই সমস্যার সমাধানে আপনি ‘পাসওয়ার্ড ম্যানেজার’ ব্যবহার করতে পারেন যা আপনার সব কঠিন পাসওয়ার্ড নিরাপদে মনে রাখবে।

টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA): নিরাপত্তার দ্বিতীয় স্তর

আপনার পাসওয়ার্ড যদি কেউ জেনেও যায়, তবুও আপনার অ্যাকাউন্ট রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন বা 2FA। এটি সচল থাকলে পাসওয়ার্ড দেওয়ার পর আপনার মোবাইলে একটি ওটিপি (OTP) বা বিশেষ কোড আসবে, যা ছাড়া অ্যাকাউন্টে ঢোকা সম্ভব নয়। ফেসবুক, জিমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ব্যাংকিং অ্যাপে অবশ্যই এই ফিচারটি চালু রাখা উচিত। এটি আপনার ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের চারপাশে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করে। বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধীরা এতটাই উন্নত যে কেবল পাসওয়ার্ড দিয়ে নিজেকে নিরাপদ ভাবাটা হবে এক ধরণের বোকামি।

ফিশিং অ্যাটাক: ফাঁদ চেনার উপায়

ফিশিং হলো সাইবার অপরাধীদের সবচেয়ে পুরনো এবং কার্যকর কৌশল। হ্যাকাররা আপনাকে এমন একটি ইমেল বা মেসেজ পাঠাবে যা দেখতে হুবহু আপনার ব্যাংক, ফেসবুক বা কোনো নামী প্রতিষ্ঠানের মতো। সেখানে একটি লিঙ্কে ক্লিক করতে বলা হবে এবং বলা হবে আপনার অ্যাকাউন্টটি ঝুঁকির মুখে আছে। আপনি সেই লিঙ্কে ক্লিক করে লগইন করা মাত্রই আপনার ইউজারনেম এবং পাসওয়ার্ড হ্যাকারের কাছে চলে যাবে। মনে রাখবেন, কোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান কখনো আপনার কাছে ইমেল বা মেসেজে পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চাইবে না। কোনো সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করার আগে ইউআরএল (URL) ভালো করে পরীক্ষা করুন এবং সরাসরি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন।

পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহারের ঝুঁকি

ফ্রি ওয়াইফাই পেলে আমরা অনেকেই খুশিতে সেটি ব্যবহার করতে শুরু করি। কিন্তু রেল স্টেশন, বিমানবন্দর বা ক্যাফের পাবলিক ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত অসুরক্ষিত হতে পারে। হ্যাকাররা একই নেটওয়ার্কে থেকে আপনার ফোনের ডেটা চুরি করতে পারে। যদি জরুরি প্রয়োজনে পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করতেই হয়, তবে কখনোই সেখানে ব্যাংকিং লেনদেন বা সেনসিটিভ কোনো অ্যাকাউন্টে লগইন করবেন না। সম্ভব হলে একটি ভালো মানের ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করুন যা আপনার ইন্টারনেট ট্রাফিককে এনক্রিপ্ট করে হ্যাকারদের নজরদারি থেকে বাঁচাবে।

পরিবার ও শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা

সাইবার জগতের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি থাকে আমাদের শিশুদের ওপর। ইন্টারনেটের অন্ধকার জগত বা ‘ডার্ক ওয়েব’ থেকে শিশুদের দূরে রাখতে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। শিশুদের ডিভাইসে ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ অ্যাপ ব্যবহার করুন যাতে তারা কোন ধরণের ওয়েবসাইট দেখছে তা নজরদারি করা যায়। তাদের শেখান যে ইন্টারনেটে অচেনা কারোর সাথে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা লোকেশন শেয়ার করা কতটা বিপজ্জনক। শিশুদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলুন যাতে তারা অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভয় না পেয়ে আপনার কাছে বলতে পারে। সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত।

ডিভাইস আপডেট এবং অ্যান্টিভাইরাস

আপনার ফোন বা কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম (Windows, Android, iOS) এবং অ্যাপগুলো যখনই আপডেট আসবে, সাথে সাথে করে নিন। এই আপডেটগুলোতে কেবল নতুন ফিচার থাকে না, বরং পুরনো সিকিউরিটি হোল বা নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো মেরামত করা হয়। এছাড়া ডিভাইসে একটি বিশ্বস্ত অ্যান্টিভাইরাস এবং ফায়ারওয়াল ব্যবহার করা জরুরি যা ম্যালওয়্যার বা র‍্যানসমওয়্যার থেকে আপনার ব্যক্তিগত ফাইলগুলোকে রক্ষা করবে। পাইরেটেড সফটওয়্যার বা মুভি ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ভাইরাস লুকিয়ে থাকে।

ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং গোপনীয়তা

ইন্টারনেটে আমরা যা কিছু করি, তার একটি ছাপ থেকে যায় যাকে বলা হয় ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’। সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত তথ্য শেয়ার (Oversharing) করার অভ্যাস বর্জন করুন। আপনি কোথায় আছেন, কোন রেস্টুরেন্টে খাচ্ছেন বা কখন আপনার বাড়ি ফাঁকা থাকছে—এসব তথ্য অপরাধীদের কাজ সহজ করে দেয়। ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রামের প্রাইভেসি সেটিংস মাঝে মাঝে চেক করুন এবং নিশ্চিত করুন যে আপনার পোস্টগুলো কেবল পরিচিতরাই দেখছে। মনে রাখবেন, ইন্টারনেটে একবার কোনো ছবি বা তথ্য আপলোড হলে তা চিরস্থায়ী হয়ে যেতে পারে, তাই কোনো কিছু পোস্ট করার আগে দুবার ভাবুন।

Scroll to Top