
রাস্তায় গাড়ির ধোঁয়া আর ইঞ্জিনের কানফাটানো আওয়াজ—শহুরে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে যাতায়াত ব্যবস্থায় এক নিরব বিপ্লব শুরু হয়েছে, যার নাম ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল’ বা ইভি। টেসলা থেকে শুরু করে টাটা, বিওয়াইডি—সব বড় বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এখন ঝুঁকছে ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে। জীবাশ্ম জ্বালানির (পেট্রোল, ডিজেল) ক্রমবর্ধমান দাম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে ইভি-কে দেখা হচ্ছে আগামীর একমাত্র সমাধান হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইলেকট্রিক গাড়ি কি সত্যিই ১০০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব? নাকি এটি কেবল এক ধরণের প্রযুক্তির হাতবদল মাত্র?
ইলেকট্রিক ভেহিকেল কীভাবে কাজ করে?
সাধারণ গাড়িতে যেখানে ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন (ICE) থাকে যা পেট্রোল বা ডিজেল পুড়িয়ে শক্তি উৎপন্ন করে, সেখানে ইলেকট্রিক গাড়িতে থাকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্যাক এবং একটি ইলেকট্রিক মোটর। এটি অনেকটা আমাদের স্মার্টফোনের মতো—চার্জ শেষ হলে প্লাগ-ইন করে চার্জ দিতে হয়। এর কোনো সাইলেন্সর পাইপ নেই কারণ এটি কোনো ধোঁয়া নির্গত করে না। এই সরল মেকানিজমের কারণে ইলেকট্রিক গাড়িতে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ (Maintenance cost) অনেক কম, কারণ এতে ইঞ্জিনের মতো কয়েক হাজার চলমান যন্ত্রাংশ থাকে না।
পরিবেশের ওপর প্রভাব: কার্বন নিঃসরণ হ্রাস
ইলেকট্রিক গাড়ির সবচেয়ে বড় জয়জয়কার এর শূন্য টেইলপাইপ নিঃসরণ (Zero tailpipe emission) নিয়ে। একটি সাধারণ গাড়ি প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ১২০-১৫০ গ্রাম কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছাড়ে। বিপরীতে, ইভি চলাচলের সময় কোনো ক্ষতিকর গ্যাস ছাড়ে না। এর ফলে শহরের বায়ুদূষণ নাটকীয়ভাবে কমে আসবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ। তবে সমালোচকরা বলেন, ইভি চার্জ দেওয়ার জন্য যে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, তা যদি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে, তবে পরোক্ষভাবে দূষণ থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এমনকি কয়লার বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও ইভি সাধারণ গাড়ির চেয়ে অনেক কম কার্বন নিঃসরণ করে।
ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং লিথিয়াম মাইনিংয়ের চ্যালেঞ্জ
ইভি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো এর ব্যাটারি উৎপাদন প্রক্রিয়া। ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরিতে লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং নিকেলের মতো দুষ্প্রাপ্য খনিজ প্রয়োজন হয়। এই খনিজগুলো খনি থেকে উত্তোলনের সময় প্রচুর পরিমাণে জল ব্যবহৃত হয় এবং পরিবেশগত ক্ষতি হয়। এছাড়া কোবাল্ট মাইনিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনাও ঘটে। তবে বিজ্ঞানীরা এখন ‘সলিড স্টেট ব্যাটারি’ এবং সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিয়ে কাজ করছেন যা আরও বেশি পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী হবে। এছাড়া ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, যাতে একবার ব্যবহৃত লিথিয়াম আবার কাজে লাগানো যায়।
খরচ বনাম সুবিধা: গ্রাহকের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রাথমিকভাবে একটি ইলেকট্রিক গাড়ির দাম সাধারণ গাড়ির চেয়ে বেশি মনে হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী হিসাব করলে ইভি অনেক বেশি সাশ্রয়ী। পেট্রোল বা ডিজেলের তুলনায় বিদ্যুতের খরচ অনেক কম। এছাড়া ইলেকট্রিক গাড়িতে তেল পরিবর্তন (Oil change), এয়ার ফিল্টার বা জটিল ইঞ্জিন মেরামতের ঝামেলা নেই। অনেক দেশের সরকার এখন ইভি কেনার ওপর বিশেষ ভর্তুকি এবং ট্যাক্স ছাড় দিচ্ছে। স্মার্ট টেকনোলজির কারণে এই গাড়িগুলো অনেক বেশি নিরাপদ এবং এতে অটো-পাইলট বা অ্যাডভান্সড ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম (ADAS) এর মতো আধুনিক ফিচার সহজেই যুক্ত করা সম্ভব।
চার্জিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার: আগামীর প্রধান চ্যালেঞ্জ
ইভি বিপ্লবের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো চার্জিং স্টেশনের অভাব। পেট্রোল পাম্পের মতো যত্রতত্র চার্জিং স্টেশন না থাকায় মানুষ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে ভয় পায়, যাকে বলা হয় ‘রেঞ্জ এনজাইটি’ (Range Anxiety)। তবে বর্তমানে হাইওয়েগুলোতে ফাস্ট-চার্জিং স্টেশন বসানো হচ্ছে যা মাত্র ২০-৩০ মিনিটে গাড়ির ব্যাটারি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করতে পারে। এছাড়া বাড়ির গ্যারেজে বা অফিসের পার্কিংয়ে চার্জ দেওয়ার সুবিধা ইভি-কে আরও জনপ্রিয় করে তুলছে। ভবিষ্যতে ওয়্যারলেস চার্জিং বা রাস্তা দিয়ে চলার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হওয়ার প্রযুক্তির ওপরও গবেষণা চলছে।
অটোনোমাস ড্রাইভিং ও স্মার্ট ট্রান্সপোর্টেশন
ইলেকট্রিক ভেহিকেল কেবল জ্বালানি পরিবর্তন করছে না, এটি যাতায়াত ব্যবস্থাকে স্মার্ট করে তুলছে। অধিকাংশ ইভি-তে বিল্ট-ইন সফটওয়্যার থাকে যা ট্রাফিক জ্যাম এড়ানো, ব্যাটারি লাইফ অপ্টিমাইজ করা এবং স্বয়ংক্রিয় পার্কিংয়ে সাহায্য করে। ইভি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মিলে ভবিষ্যতে চালকবিহীন বা ‘অটোনোমাস’ যাতায়াত ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এটি সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এবং যাতায়াতের সময়কে আরও উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে সাহায্য করবে। শহরগুলোর পরিকল্পনা এখন ইভি-বান্ধব করা হচ্ছে, যেখানে সর্বত্র স্মার্ট চার্জিং পয়েন্ট থাকবে।




