টেরাকোটার শহর বিষ্ণুপুর: যেখানে মন্দিরের গায়ে ইতিহাস কথা বলে

টেরাকোটার শহর বিষ্ণুপুর: যেখানে মন্দিরের গায়ে ইতিহাস কথা বলে

বাংলার সংস্কৃতির কথা উঠলে যার নাম সবার আগে মনে পড়ে, তা হলো বাঁকুড়া জেলার ছোট এক শহর—বিষ্ণুপুর। মল্লভুমের এই রাজধানীটি কেবল একটি শহর নয়, বরং এটি বাংলার স্থাপত্য শিল্পের এক জীবন্ত জাদুঘর। ষোড়শ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে যে মন্দির স্থাপত্য শৈলী গড়ে উঠেছিল, তা আজ সারা বিশ্বের পর্যটক এবং ইতিহাসবিদদের কাছে পরম বিস্ময়ের বিষয়। পাথরের অভাব থাকায় এই অঞ্চলের কারিগররা মাটি পুড়িয়ে তৈরি করেছিলেন অনন্য সব টেরাকোটা বা পোড়ামাটির অলঙ্করণ, যা আজও অম্লান হয়ে টিকে আছে।

মল্ল রাজবংশের ইতিহাস ও বিষ্ণুপুরের উত্থান

বিষ্ণুপুরের সমৃদ্ধির মূলে রয়েছে মল্ল রাজবংশ। আদি মল্ল থেকে শুরু করে রঘুনাথ মল্ল এবং বীর হাম্বীর—প্রত্যেক রাজা এই শহরকে সুসজ্জিত করেছেন। বিশেষ করে রাজা বীর হাম্বীর যখন বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন, তখন থেকেই বিষ্ণুপুর মন্দির নগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। রাজারা এখানে রাধাকৃষ্ণের অগণিত মন্দির নির্মাণ করেন। বিষ্ণুপুর এক সময় এতটাই সুরক্ষিত ছিল যে একে ‘বাংলার দুর্গ’ বলা হতো। এখানে কেবল স্থাপত্য নয়, গান-বাজনার ক্ষেত্রেও ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’ তৈরি হয়েছিল যা ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে।

টেরাকোটা শিল্প: পোড়ামাটির মহাকাব্য

বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলোর প্রধান আকর্ষণ হলো এর দেওয়ালে খোদাই করা পোড়ামাটির কাজ। মন্দিরের প্রতিটি ইঞ্চিতে ফুটে উঠেছে রামায়ন, মহাভারত এবং কৃষ্ণলীলার কাহিনী। এছাড়া তৎকালীন সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, শিকারের দৃশ্য, এবং সুসজ্জিত নর্তকীদের অবয়ব অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই শিল্পকলা প্রমাণ করে যে তৎকালীন বাংলার শিল্পীরা জ্যামিতিক জ্ঞান এবং কারিগরি দক্ষতায় কতটা উন্নত ছিলেন। রাসমঞ্চ, শ্যামরাই মন্দির এবং জোড়বাংলো মন্দিরের টেরাকোটা প্যানেলগুলো দেখলে মনে হয় যেন মাটির গায়ে ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠছে।

স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শণ: রাসমঞ্চ ও শ্যামরাই

বিষ্ণুপুরের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা হলো ‘রাসমঞ্চ’। ১৬০০ সালে রাজা বীর হাম্বীর এটি নির্মাণ করেন। এর গঠনশৈলী পৃথিবীর অন্য কোনো মন্দিরের সাথে মেলে না। এটি একটি পিরামিড আকৃতির বিশাল মঞ্চ, যার ওপরের অংশটি বাংলার পরিচিত কুঁড়েঘরের চালার মতো। রাসমঞ্চে এক সময় মল্লভুমের সমস্ত বিগ্রহকে আনা হতো উৎসবের সময়। অন্যদিকে, ১৬৪৩ সালে নির্মিত ‘শ্যামরাই মন্দির’ তার পাঁচটি চূড়া বা পঞ্চরত্ন শৈলীর জন্য বিখ্যাত। এই মন্দিরের দেওয়ালে বিষ্ণুর দশ অবতার এবং কৃষ্ণের নানা লীলা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা আছে।

দলমাদল কামান এবং বীরত্বের কাহিনী

বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্য কেবল মন্দিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার ‘দলমাদল’ কামানটি মল্ল রাজাদের সামরিক শক্তির প্রতীক। কথিত আছে, ১৭৪২ সালে যখন মারাঠা দস্যুরা (বর্গী) বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে, তখন স্বয়ং মদনমোহন (শ্রীকৃষ্ণ) এই কামান দেগে শত্রুদের বিতাড়িত করেছিলেন। প্রায় ১২ ফুট লম্বা এই কামানটি এমন এক বিশেষ লোহার সংকর দিয়ে তৈরি যাতে আজও কোনো মরিচা ধরেনি। এটি প্রাচীন ভারতের ধাতুবিদ্যার এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আজও পর্যটকরা এই বিশালাকার কামানের সামনে দাঁড়িয়ে মল্ল বীরদের শৌর্য-বীর্যের কথা স্মরণ করেন।

বিষ্ণুপুরের সিল্ক ও বালুচরী শাড়ি

স্থাপত্যের পাশাপাশি বিষ্ণুপুরের আরেকটি বড় ঐতিহ্য হলো ‘বালুচরী শাড়ি’। এই শাড়ির বিশেষত্ব হলো এর আঁচল এবং পাড়ে সুতোর কাজে ফুটিয়ে তোলা হয় পুরাণের বিভিন্ন দৃশ্য বা ঐতিহাসিক কাহিনী। একটি বালুচরী শাড়ি তৈরি করতে তাঁতিদের কঠোর পরিশ্রম এবং ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। আগে এই শাড়িগুলো মুর্শিদাবাদে তৈরি হলেও পরবর্তীতে বিষ্ণুপুরই এর প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। আজ বালুচরী শাড়ি জিআই (GI) ট্যাগ প্রাপ্ত এবং এটি বাংলার এক অমূল্য সাংস্কৃতিক সম্পদ যা বিশ্ব দরবারে সমাদৃত।

সংরক্ষণ ও পর্যটনের গুরুত্ব

বিষ্ণুপুরের এই অমূল্য সম্পদগুলো রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) বর্তমানে এই মন্দিরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করছে। তবুও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অযত্নের ফলে অনেক সূক্ষ্ম কাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিষ্ণুপুরের উন্নয়ন হলে স্থানীয় তাঁতি এবং শিল্পীদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। শীতকালে বিষ্ণুপুর মেলা এবং ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর এই শহরের মায়াবী রূপকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বাংলার মাটির এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে অনুভব করতে হলে জীবনে একবার হলেও বিষ্ণুপুর ভ্রমণ করা প্রয়োজন।

Scroll to Top