পৃথিবীর ৫টি রহস্যময় স্থান: যেখানে বিজ্ঞানও থমকে দাঁড়ায়!

পৃথিবীর ৫টি রহস্যময় স্থান: যেখানে বিজ্ঞানও থমকে দাঁড়ায়!

পৃথিবীর রহস্যময় স্থান ও বিজ্ঞান

আমাদের এই পৃথিবী যেমন সুন্দর, ঠিক তেমনি রহস্যে ঘেরা। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আমরা মহাকাশে পৌঁছেছি, সমুদ্রের তলদেশ জয় করেছি, কিন্তু আজও এই গ্রহের এমন কিছু স্থান রয়েছে যার রহস্যের কিনারা বিজ্ঞানীরা করতে পারেননি। এই স্থানগুলোর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য এবং ভৌগোলিক পরিবেশ আমাদের চেনা লজিক বা বিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানায়। আজকের ব্লগে আমরা বিশ্বের এমন ৫টি রহস্যময় স্থান সম্পর্কে জানব, যা আপনাকে অবাক হতে বাধ্য করবে।

১. বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল (The Bermuda Triangle), উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর

বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় স্থানের তালিকায় সম্ভবত সবার উপরে থাকবে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল। মিয়ামি, বারমুডা এবং পুয়ের্তো রিকোর মধ্যবর্তী এই অঞ্চলে গত ১০০ বছরে অসংখ্য জাহাজ এবং বিমান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিখোঁজ হওয়া এসব যানগুলোর কোনো ধ্বংসাবশেষ বা যাত্রীদের হদিস কখনোই পাওয়া যায়নি। অনেক সময় পাইলটরা জানিয়েছেন যে, এই এলাকায় প্রবেশের পর তাদের কম্পাস কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং আকাশে অদ্ভুত আলো দেখা গিয়েছিল। অনেকে একে ভিনগ্রহের প্রাণীদের কাজ বলে মনে করেন, আবার বিজ্ঞানীদের মতে এখানে সমুদ্রের নিচে শক্তিশালী মিথেন গ্যাসের বুদবুদ বা বিশেষ চৌম্বকীয় ক্ষেত্র থাকতে পারে। তবে কোনো যুক্তিই আজ পর্যন্ত অকাট্য প্রমাণিত হয়নি।

২. রক্তপ্রপাত (Blood Falls), অ্যান্টার্কটিকা

বরফে ঢাকা সাদা অ্যান্টার্কটিকার এক বিশাল হিমবাহ থেকে আচমকাই গড়িয়ে পড়ছে টকটকে লাল রঙের জল। দেখলে মনে হবে যেন কোনো ক্ষত থেকে রক্ত বের হচ্ছে। টেইলর হিমবাহের এই অংশটি ‘ব্লাড ফলস’ বা রক্তপ্রপাত নামে পরিচিত। ১৯১১ সালে প্রথম এটি আবিষ্কৃত হয়। প্রথমে ভাবা হয়েছিল কোনো বিশেষ শ্যাওলার কারণে এই লাল রং, কিন্তু পরে গবেষণায় দেখা গেছে যে হিমবাহের নিচে একটি প্রাচীন লোনা জলের হ্রদ রয়েছে যা বায়ুমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই জলে প্রচুর পরিমাণে আয়রন বা লোহা রয়েছে। যখন এই জল হিমবাহের ফাটল দিয়ে বাইরে আসে এবং বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন লোহার সাথে অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় এটি লাল মরিচার রং ধারণ করে। তবে এই মৃতপ্রায় পরিবেশে কীভাবে মাইক্রোবস বা অণুজীবরা বেঁচে আছে, তা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক গবেষণার বিষয়।

৩. ডোর টু হেল (Door to Hell), তুর্কমেনিস্তান

তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমির মাঝখানে অবস্থিত এক বিশাল গহ্বর, যা গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একনাগাড়ে জ্বলছে। স্থানীয় মানুষ একে ‘জাহান্নামের দরজা’ বলে ডাকেন। এটি কোনো প্রাকৃতিক অগ্নুৎপাত নয়। ১৯৭১ সালে সোভিয়েত ইঞ্জিনিয়াররা এখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধানে খনন কাজ শুরু করেছিলেন। হঠাৎ মাটির ধসে এক বিশাল গর্ত তৈরি হয় এবং বিষাক্ত মিথেন গ্যাস ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে তারা সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দেন। তারা ভেবেছিলেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গ্যাস ফুরিয়ে যাবে এবং আগুন নিভে যাবে। কিন্তু সেই আগুন আজও জ্বলছে। রাতের অন্ধকারে মরুভূমির মাঝে এই আগুনের আভা এক ভয়াবহ অথচ অপার্থিব দৃশ্যের জন্ম দেয়।

৪. এটারনাল ফ্লেম ফলস (Eternal Flame Falls), নিউ ইয়র্ক

নিউ ইয়র্কের শেস্টনাট রিজ পার্কে একটি ছোট জলপ্রপাত রয়েছে যার ভেতরে একটি শিখা অবিরাম জ্বলছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জলপ্রপাতের ঝরনার নিচে আগুন কীভাবে জ্বলা সম্ভব? এর কারণ হলো জলপ্রপাতের নিচ থেকে নির্গত হওয়া প্রাকৃতিক গ্যাস। পাথরের খাঁজ দিয়ে এই গ্যাস লিক হয়ে বাইরে আসে। কোনো এক সময় পর্যটকদের জ্বালানো আগুন এখানে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। মাঝে মাঝে জলপ্রপাতের জলের ঝাপটায় আগুন নিভে গেলেও পর্যটকরা আবার তা জ্বালিয়ে দেন। তবে ভূবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরণের গ্যাস সাধারণত অনেক গভীরে এবং গরম পাথরে তৈরি হয়, কিন্তু এখানকার পাথরগুলো অনেক ঠান্ডা। তাহলে এই গ্যাস কোথা থেকে আসছে, তা এক বড় রহস্য।

৫. নাজকা লাইনস (Nazca Lines), পেরু

পেরুর মরুভূমিতে মাটির ওপর আঁকা বিশাল সব জ্যামিতিক নকশা এবং প্রাণীর ছবি হলো নাজকা লাইনস। এগুলো এতটাই বিশাল যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে এগুলো বোঝা অসম্ভব, কেবল আকাশ থেকে বা পাহাড়ের ওপর থেকেই এই ছবিগুলো দেখা যায়। প্রায় ২,০০০ বছর আগে নাজকা সভ্যতার মানুষরা এগুলো তৈরি করেছিল। সেই সময়ে কোনো আকাশযান বা উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া কীভাবে এত নিখুঁত এবং বিশাল আকৃতির (কিছু নকশা প্রায় ১,০০০ ফুট বড়) ছবি আঁকা সম্ভব হয়েছিল, তা আজও প্রত্নতাত্ত্বিকদের ভাবিয়ে তোলে। কেন তারা এগুলো এঁকেছিল—দেবতাদের দেখানোর জন্য নাকি কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রয়োজনে, তার সঠিক উত্তর আজও অজানা।

এই স্থানগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি আজও তার অনেক গোপন রহস্য নিজের বুকে আগলে রেখেছে। বিজ্ঞান হয়তো একদিন এগুলোর সমাধান দেবে, কিন্তু আপাতত এই রহস্যগুলোই পৃথিবীকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।

Scroll to Top