
বাঙালির ঋতুচক্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব হলো বসন্ত উৎসব। আর এই বসন্ত উৎসবের কথা উঠলে যার নাম সবার আগে মনে আসে তা হলো বীরভূমের লাল মাটির শান্তিনিকেতন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২০-এর দশকে যখন বিশ্বভারতীর আম্রকুঞ্জে বসন্তের আবাহন শুরু করেছিলেন তখন তা ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের এক নিবিড় মিলন। আজ সেই উৎসব কেবল শান্তিনিকেতনের সীমানায় আবদ্ধ নেই বরং তা বিশ্বজুড়ে বাঙালির এক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলাশ ফুলের লাল আভা আবিরের রঙের সাথে মিশে শান্তিনিকেতনের আকাশ-বাতাসকে যখন রাঙিয়ে দেয় তখন মনে হয় যেন স্বয়ং বসন্ত তার পূর্ণ রূপ নিয়ে এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছে। আজ আমরা শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এর অন্তর্নিহিত দর্শন এবং এর বর্তমান রূপ নিয়ে এক সুদীর্ঘ আলোচনা করব।
বসন্ত উৎসবের সূচনা ও রবীন্দ্র দর্শন
শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসবের সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত ঘরোয়াভাবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষা কেবল চার দেওয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃতির পরিবর্তনকে অনুভব করা এবং তার সাথে একাত্ম হওয়াই হলো প্রকৃত শিক্ষা। ১৯২০ সালে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর ফাল্গুনের পূর্ণিমা তিথিতে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের নিয়ে তিনি এই উৎসবের সূচনা করেন। এর আগে ১৯০৭ সালে বসন্তের শুরুতে ‘শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ প্রথম ঋতু উৎসবের পরিকল্পনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে বসন্ত ছিল নতুনের প্রতীক পুরাতনকে ঝরিয়ে দিয়ে জীবনের জয়গান গাওয়ার ঋতু। তিনি লিখেছেন ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল লাগল দোল। এই একটি লাইনেই লুকিয়ে আছে বসন্ত উৎসবের মূল উদ্দেশ্য—মনের দরজা খুলে বাইরের জগতের আনন্দকে আপন করে নেওয়া।
শান্তিনিকেতনের প্রস্তুতি: যখন প্রকৃতি সেজে ওঠে
বসন্ত আসার অনেক আগে থেকেই শান্তিনিকেতনের গাছপালা তাদের রূপ বদলাতে শুরু করে। ঝরে যাওয়া পাতাদের জায়গায় উঁকি দেয় কচি সবুজ কিশলয়। শিমুল আর পলাশের আগুনে রঙে আকাশ রাঙা হয়ে ওঠে। বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীরা বসন্ত উৎসবের মাস খানেক আগে থেকেই মহড়া শুরু করে। আশ্রমের প্রতিটি কোণ থেকে ভেসে আসে এসো হে বৈশাখ বা ওরে ওরে ওরে আমার মন মেতেছে গানের সুর। মেয়েরা হলুদ শাড়ি আর ছেলেরা সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে নিজেদের সাজিয়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়। খোঁপায় গোঁজা থাকে পলাশ ফুল আর গলায় থাকে গাঁদা ফুলের মালা। এই সাজগোজ কেবল আভিজাত্য নয় বরং এটি প্রকৃতির প্রতি এক ধরণের বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।
উত্তরায়ণের প্রাতঃভ্রমণ এবং বৈতালিক
বসন্ত উৎসবের দিন শুরু হয় খুব ভোরে বৈতালিকের মাধ্যমে। আশ্রমের ছাত্রছাত্রীরা গানের সুরে ঘুরে ঘুরে সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। হালকা কুয়াশা আর বসন্তের মিঠে রোদের মাঝে সেই সুর যখন বাতাসে ভেসে বেড়ায় তখন এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। এরপর শুরু হয় প্রভাতফেরি। হাতে হাতে আবিরের থালা আর গানের তালে তালে নাচের দল যখন গৌর প্রাঙ্গণের দিকে এগিয়ে যায় তখন সেই দৃশ্য বর্ণনা করার ভাষা থাকে না। রবীন্দ্রনাথের গান আর নৃত্যের এমন মেলবন্ধন পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। শান্তিনিকেতনের ডাস্ট বা ধুলোও যেন সেদিন আবিরের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।
আম্রকুঞ্জে রঙের খেলা ও গান
বসন্ত উৎসবের মূল অনুষ্ঠানটি হয় আম্রকুঞ্জে। আমগাছের ছায়ায় শান্তিনিকেতনি কায়দায় আলপনা দেওয়া মঞ্চে চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গানের পর গান আর নাচের ছন্দে সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। এই উৎসবে কোনো কৃত্রিমতা নেই নেই কোনো উচ্চ শব্দে ডিজে মিউজিক। আছে একতারার সুর আর খোল-করতালের ছন্দ। উপস্থিত দর্শনার্থীরাও এই রঙের খেলায় মেতে ওঠেন। তবে শান্তিনিকেতনের আবির খেলার একটি বিশেষ নিয়ম আছে। এখানে কেউ কাউকে জোর করে রঙ মাখায় না বরং গুরুজনদের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করা এবং সমবয়সীদের গালে আলতো করে আবিরের ছোঁয়া দেওয়াই হলো এখানকার রীতি। এই মার্জিত রুচিবোধই শান্তিনিকেতনকে আলাদা করে রাখে।
খোয়াইয়ের সোনাঝুরি ও বাউল গান
মূল অনুষ্ঠানের পর বিকেলে মানুষের ঢল নামে সোনাঝুরি বনের দিকে। খোয়াইয়ের লাল মাটির উঁচু-নিচু পথের ধারে বাউলরা একতারা হাতে বসে গান ধরেন। তাদের গানের কথায় লুকিয়ে থাকে সহজ জীবন দর্শন। সাঁওতালি নাচের মাদলের শব্দে জঙ্গল মুখরিত হয়ে ওঠে। হস্তশিল্পের হাটে ভিড় জমান পর্যটকরা। শান্তিনিকেতনি চামড়ার কাজ পোড়ামাটির গয়না আর কাঁথা স্টিচের শাড়ি কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। সোনাঝুরির সেই ধূসর বিকেলের মায়াবী আলো যখন বাউলের গালে পড়ে তখন মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে কোনো এক আদিম সংস্কৃতির কোলে।
আধুনিক সময়ে বসন্ত উৎসব: চ্যালেঞ্জ ও বিবর্তন
বর্তমান সময়ে শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব এক বিশাল আকার ধারণ করেছে। লক্ষ লক্ষ পর্যটকের ভিড় সামলানো বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিড়ের কারণে অনেক সময় উৎসবের সেই আদি স্নিগ্ধতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও সাধারণ মানুষের আবেগ আর কবিগুরুর প্রতি ভালোবাসার টানে মানুষ ছুটে আসেন এই লাল মাটির দেশে। গত কয়েক বছরে ভিড় এড়াতে অনুষ্ঠানের সময়সূচী ও নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিন্তু বসন্তের সেই সুর আজও প্রতিটি আম্রপল্লবে অনুরণিত হয়। শান্তিনিকেতনের মানুষের কাছে এই উৎসব কেবল একদিনের নয় এটি এক সারা বছরের অপেক্ষা।
প্রাণের উৎসব বসন্ত
শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির সাথে সন্ধি করে বাঁচতে হয়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে আনন্দ একার নয় আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার বিষয়। পলাশ ফুলের সেই লাল রঙ আমাদের মনের ভেতরের জড়তা দূর করে এক নতুন উৎসাহের জন্ম দেয়। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে শান্তিনিকেতনের এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা প্রকৃতিরই অংশ। তাই প্রতি বছর ফাল্গুন পূর্ণিমায় যখন চাঁদের আলোয় আম্রকুঞ্জ ভেসে যায় তখন মনে মনে প্রতিটি বাঙালি গেয়ে ওঠে আজ সবারে খলিতে হবে। শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব কেবল একটি পার্বন নয় এটি বাঙালির বেঁচে থাকার এক অন্যতম রসদ।










