
ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত মুর্শিদাবাদ শহরটি কেবল একটি জনপদ নয় বরং এটি ভারতীয় উপমহাদেশের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। পলাশীর যুদ্ধের সেই বিশ্বাসঘাতকতা নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান—সবই এই মাটির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। আর এই মুর্শিদাবাদের বুকে গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল স্থাপত্য যার নাম হাজারদুয়ারি প্রাসাদ। এর বিশালতা এর স্থাপত্যশৈলী এবং এর ভেতরে থাকা হাজার হাজার অমূল্য সংগ্রহ পর্যটকদের এক লহমায় নবাবী আমলে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আজ আমরা এই হাজারদুয়ারি প্রাসাদের নেপথ্য কাহিনী এর নির্মাণশৈলী এবং মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
হাজারদুয়ারি নির্মাণের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
হাজারদুয়ারি প্রাসাদটি কিন্তু সিরাজউদ্দৌলার সময়ে তৈরি হয়নি। এটি নির্মিত হয়েছিল ১৮২৯ থেকে ১৮৩৭ সালের মধ্যে নবাব নাজিম হুমায়ুন ঝা-এর শাসনকালে। ব্রিটিশ স্থপতি ডানকান ম্যাকলিওড এই প্রাসাদের নকশা করেছিলেন। ইতালীয় এবং গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে তৈরি এই প্রাসাদটি মূলত নবাবদের প্রশাসনিক কাজ এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের জন্য ব্যবহৃত হতো। যদিও সিরাজউদ্দৌলার আদি প্রাসাদটি আজ ভাগীরথীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তবে হাজারদুয়ারি আজও সেই হারানো জৌলুসের পরিচয় বহন করে চলেছে। প্রায় ৪১ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এই নিজামত কেল্লা চত্বরটি একসময় গোটা ভারতের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
স্থাপত্যের বিস্ময়: হাজারটি দরজার রহস্য
এই প্রাসাদের নামকরণ করা হয়েছে হাজারদুয়ারি কারণ এখানে তাত্ত্বিকভাবে এক হাজারটি দরজা রয়েছে। তবে এর মধ্যে নয়শোটি দরজাই হলো ভুয়া বা নকল। শত্রু আক্রমণ থেকে নবাবকে বাঁচাতে এবং আক্রমণকারীদের বিভ্রান্ত করতে এই অভিনব স্থাপত্য কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল। কোনো শত্রু যদি প্রাসাদে ঢুকে পড়ত তবে সে এই নকল দরজাগুলো দেখে দ্বিধায় পড়ে যেত এবং আসল দরজার হদিস পাওয়া তার জন্য অসম্ভব হয়ে উঠত। বিশাল বিশাল থাম এবং চওড়া বারান্দা এই প্রাসাদকে এক রোমান রাজপ্রাসাদের রূপ দিয়েছে। প্রাসাদের উত্তর দিকে রয়েছে সেই বিখ্যাত বড় সিঁড়ি যা দিয়ে একসময় নবাব এবং ব্রিটিশ লর্ডরা হাতিতে চড়ে সোজা দোতলায় উঠে যেতেন।
অস্ত্রাগার এবং ইতিহাসের ভয়ংকর সব হাতিয়ার
হাজারদুয়ারি প্রাসাদের নিচতলায় রয়েছে এক বিশাল মিউজিয়াম বা অস্ত্রাগার যা ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহশালা। এখানে নবাবদের ব্যবহৃত তলোয়ার বর্ম ঢাল এবং বন্দুক সাজানো রয়েছে। এখানকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ হলো নাদির শাহের তলোয়ার এবং মীর জাফরের ব্যক্তিগত অস্ত্রশস্ত্র। এছাড়া রয়েছে সেই ঐতিহাসিক অস্ত্র যা দিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করা হয়েছিল বলে অনেকে দাবি করেন। এই অস্ত্রাগারে প্রবেশ করলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায় কারণ প্রতিটি অস্ত্রের সাথে জড়িয়ে আছে কোনো না কোনো যুদ্ধ বা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ইতিহাস।
বিশাল ঝাড়লন্ঠন ও অমূল্য চিত্রশালা
প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করলে আপনার চোখ ধাঁধিয়ে যাবে এখানকার ঝাড়লন্ঠনগুলো দেখে। দরবার হলে রয়েছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ঝাড়লন্ঠন যা ভিক্টোরিয়া কুইন নবাবকে উপহার দিয়েছিলেন। এই ঝাড়লন্ঠনটিতে ১০১টি মোমবাতি জ্বালানো হতো যা একসময় পুরো হলঘরকে দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল করে তুলত। এছাড়া প্রাসাদের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে বিখ্যাত সব ইতালীয় এবং ইউরোপীয় শিল্পীদের আঁকা তৈলচিত্র। নবাবদের পোর্ট্রেট থেকে শুরু করে শিকারের দৃশ্য—সবই এখানে অত্যন্ত যত্ন সহকারে রাখা হয়েছে। এখানকার লাইব্রেরিতে রয়েছে প্রায় সাত হাজারেরও বেশি দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি যার মধ্যে সোনার জলে লেখা পবিত্র কোরআন শরীফ অন্যতম।
গোপন সুড়ঙ্গ ও ট্র্যাজেডির গল্প
লোকমুখে প্রচলিত আছে যে হাজারদুয়ারি প্রাসাদের নিচ দিয়ে ভাগীরথী নদীর ওপাড়ে নবাবদের সমাধি ক্ষেত্র বা খোশবাগ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ পথ ছিল। যদিও আজ নিরাপত্তার খাতিরে সেই সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তবে আজও রহস্যপ্রেমীদের কাছে এটি এক বড় আকর্ষণ। হাজারদুয়ারি চত্বরেই দাঁড়িয়ে আছে বড় ইমামবাড়া যা ভারতের বৃহত্তম ইমামবাড়াগুলোর মধ্যে একটি। এর ঠিক সামনেই রয়েছে সেই বিশাল কামান যার নাম জাহান কোষ। এই কামানটি এতটাই বড় ছিল যে এটি দাগলে কয়েক কিলোমিটার দূরেও মাটি কেঁপে উঠত। মুর্শিদাবাদের বাতাসে আজও নবাব সিরাজের সেই দীর্ঘশ্বাস এবং পলাশীর প্রান্তরের কান্নার সুর যেন মিশে আছে।
মুর্শিদাবাদের পতন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
হাজারদুয়ারি প্রাসাদ এখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনে একটি জাতীয় জাদুঘর। পর্যটকরা এখানে আসেন ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে। কিন্তু প্রাসাদের বাইরে বেরোলেই দেখা যায় মুর্শিদাবাদের সেই জীর্ণ দশা। একসময় যে শহরটি লন্ডনের চেয়েও সমৃদ্ধশালী ছিল আজ তা কেবল পর্যটন নির্ভর একটি ছোট শহর। ভাগীরথীর ভাঙন এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মুর্শিদাবাদের অনেক ছোট ছোট স্মৃতিস্তম্ভ হারিয়ে যেতে বসেছে। হাজারদুয়ারি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও এর প্রতিটি কোণ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বাসঘাতকতা কীভাবে একটি গোটা সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
ভ্রমণ টিপস ও যাতায়াত
মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের সেরা সময় হলো শীতকাল। কলকাতা থেকে সরাসরি ট্রেনে বা সড়কপথে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় এখানে পৌঁছানো যায়। হাজারদুয়ারি মিউজিয়াম দেখার পাশাপাশি পর্যটকদের উচিত কাটরা মসজিদ নসিপুর রাজবাড়ি এবং জাফরগঞ্জ কবরস্থান ঘুরে দেখা। তবে মনে রাখবেন শুক্রবার হাজারদুয়ারি মিউজিয়াম বন্ধ থাকে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী কাঠের কাজ এবং রেশমের কাপড় আপনার কেনাকাটার তালিকায় অবশ্যই থাকা উচিত।
ইতিহাসের নীরব দর্পণ
হাজারদুয়ারি কেবল পাথর আর ইটের তৈরি একটি ইমারত নয় এটি বাংলার দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। নবাবী আমলের সেই জাঁকজমক আর ব্রিটিশদের কূটনীতি—সবই এই প্রাসাদের দেওয়ালে লেখা আছে। আমরা যখন এই প্রাসাদের বারান্দা দিয়ে হাঁটি তখন আমরা কেবল স্থাপত্য দেখি না আমরা অনুভব করি বাংলার সেই হারানো স্বাধীনতাকে। মুর্শিদাবাদ আমাদের শেখায় যে ক্ষমতার দম্ভ চিরস্থায়ী নয় কিন্তু শিল্প ও বীরত্ব যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে। হাজারদুয়ারি যেন চিরকাল বাংলার এই ট্র্যাজিক মহাকাব্যের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের বুক জুড়ে টিকে থাকে।










