
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার মালদহ জেলার নাম শুনলে সবার আগে গৌড়ের কথা মনে পড়লেও তার ঠিক পাশেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগীয় বাংলার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজধানী পান্ডুয়া যা ইতিহাসে ফিরোজাবাদ নামেও পরিচিত ছিল। চতুর্দশ শতাব্দীতে যখন বাংলার সুলতানরা দিল্লির শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখন গৌড় থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করে এই পান্ডুয়াতেই আনা হয়েছিল। গৌড়ের স্থাপত্যে যেখানে ইটের প্রাধান্য দেখা যায় পান্ডুয়ার স্থাপত্যে সেখানে বিশাল বিশাল কালো পাথরের কাজ পর্যটকদের স্তম্ভিত করে দেয়। এই শহরটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল না বরং এটি ছিল সুফি সাধক ও আউলিয়াদের মিলনস্থল। আজ আমরা এই বিস্মৃত রাজধানীর রাজকীয় স্থাপত্য এর পেছনে থাকা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এখানকার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব নিয়ে এক গভীর আলোচনায় প্রবেশ করব যা আমাদের বাংলার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।
পান্ডুয়ার ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব
পান্ডুয়া মূলত গৌড় থেকে প্রায় ২০ মাইল উত্তরে অবস্থিত একটি সমতল ভূমি যা মহানন্দা নদীর খুব কাছে অবস্থিত। ইলিয়াস শাহী বংশের শাসকরা যখন দিল্লির তুঘলক সুলতানদের আক্রমণের ভয়ে ভীত ছিলেন তখন তাঁরা পান্ডুয়াকে রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কারণ এর চারপাশে থাকা ঘন জঙ্গল এবং জলাভূমি এক প্রাকৃতিক দুর্গের মতো কাজ করত। ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে যখন সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের মুখোমুখি হয়েছিলেন তখন এই পান্ডুয়াই ছিল তাঁর প্রধান ভরসা। এই শহরের নাম পরিবর্তন করে ফিরোজাবাদ রাখা হয়েছিল এবং এটি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল। বর্তমানে আমরা পান্ডুয়া বলতে যে অঞ্চলটি দেখি তার ধ্বংসাবশেষের বিস্তার দেখে বোঝা যায় যে একসময় এটি কত বড় এবং জনবহুল শহর ছিল।
আদিনা মসজিদ: ভারতের বৃহত্তম মসজিদের স্থাপত্য শৈলী
পান্ডুয়ার প্রধান এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর আকর্ষণ হলো আদিনা মসজিদ। ১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সিকান্দার শাহ এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন যা তৎকালীন সময়ে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। আদিনার স্থাপত্যশৈলী দেখলে মনে হয় যেন এটি কোনো মানুষের তৈরি নয় বরং অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির স্পর্শে নির্মিত হয়েছে। মসজিদের বিশাল প্রাঙ্গণ চারশটিরও বেশি গম্বুজ এবং অসংখ্য খিলান এর আভিজাত্যের পরিচয় দেয়। মসজিদের পশ্চিম দেওয়ালের মিহরাবগুলোতে যে কালো পাথরের সূক্ষ্ম খোদাই কাজ দেখা যায় তা পৃথিবীর যেকোনো উন্নত স্থাপত্যের সাথে তুলনীয়। এখানে হিন্দু বৌদ্ধ এবং মুসলিম স্থাপত্যের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায় যা প্রমাণ করে যে তৎকালীন শিল্পীরা বিভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটাতে পারতেন। আদিনা মসজিদের ভেতরের ‘বাদশাহ কা তখত’ বা সুলতানের প্রার্থনা কক্ষটি পাথরের বিশাল বিশাল থামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা আজও অক্ষত।
একলাখি সমাধি সৌধ: বাংলার টেরাকোটা ও ইসলামিক শিল্পের মেলবন্ধন
আদিনা মসজিদের অদূরেই অবস্থিত একলাখি সমাধি সৌধ যা বাংলার স্থাপত্য ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। জনশ্রুতি আছে যে এটি নির্মাণ করতে তৎকালীন সময়ে এক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল বলেই এর নাম একলাখি। সুলতান জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ যিনি হিন্দু রাজা গণেশের পুত্র ছিলেন তাঁর এবং তাঁর পরিবারের কবর এখানে রয়েছে। এটি বাংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বর্গাকৃতির ইটের সমাধি সৌধ যার মাথায় একটি বিশাল গম্বুজ রয়েছে। একলাখির চারকোণে থাকা গোল বুরুজ এবং এর দেওয়ালের গায়ে থাকা পোড়ামাটির নকশাগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে আজও তা নতুনের মতো উজ্জ্বল। এই সমাধিটির দরজার ওপর গণেশ এবং অন্যান্য হিন্দু মোটিফের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায় যে তৎকালীন সময়ে বাংলার শিল্পকলা কোনো ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। একলাখি সমাধি সৌধটি পরবর্তীকালে গৌড় ও পান্ডুয়ার অনেক ছোট ছোট স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
কুতুবশাহী মসজিদ ও পান্ডুয়ার সুফি ঐতিহ্য
পান্ডুয়া শহরটি কেবল সুলতানদের শহর ছিল না এটি ছিল পীর ও দরবেশদের পবিত্র স্থান। এখানকার কুতুবশাহী মসজিদ যা সোনালী মসজিদ নামেও পরিচিত ছিল তা আজও এখানকার সুফি ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে মখদুম শেখ নূর কুতুব-উল-আলমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এটি নির্মিত হয়েছিল। শেখ নূর কুতুব-উল-আলম ছিলেন বাংলার এক অত্যন্ত প্রভাবশালী সুফি সাধক যাঁর আধ্যাত্মিক শক্তিতে তৎকালীন বাংলার রাজনীতিও প্রভাবিত হতো। তাঁর সমাধি বা ‘দরগাহ বাড়ি’ আজ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান। এই দরগাহ চত্বরে আজও এক পবিত্র প্রশান্তি অনুভব করা যায়। সুফিদের এই উপস্থিতির কারণেই পান্ডুয়াকে সেই সময় ‘হজরত পান্ডুয়া’ বলা হতো। প্রতি বছর উরসের সময় এখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় যা বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।
সালামি দরওয়াজা ও দুর্গ প্রাচীর
পান্ডুয়া শহরের উত্তর দিকে গেলে দেখা যায় বিশাল এক ধ্বংসপ্রাপ্ত তোরণ যা সালামি দরওয়াজা নামে পরিচিত। একসময় সুলতানদের অভিবাদন জানানোর জন্য এবং শহরের প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। যদিও আজ এর উপরিভাগ অনেকটাই ভেঙে পড়েছে তবুও এর বিশালতা দেখে আন্দাজ করা যায় যে একসময় এখান দিয়ে রাজকীয় শোভাযাত্রা যাতায়াত করত। পান্ডুয়া শহরটি ঘিরে যে মাটির উঁচু প্রাচীর বা ‘গড়’ ছিল তার চিহ্ন আজও অনেক জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায়। এই গড়গুলো মূলত বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। সুলতানদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী এবং অশ্বারোহী দল এই শহরের অলিগলিতে টহল দিত যা পান্ডুয়াকে এক দুর্ভেদ্য নগরে পরিণত করেছিল।
পান্ডুয়ার বিলুপ্তি ও গৌড়ে ফেরা
দীর্ঘ কয়েক দশক বাংলার শ্রেষ্ঠ রাজধানী থাকার পর পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পান্ডুয়া থেকে রাজধানী আবার গৌড়ে স্থানান্তরিত করা হয়। এর প্রধান কারণ ছিল জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহানন্দা নদীর গতিপথের বিচ্যুতি। জলাভূমি ও জমা জলের কারণে পান্ডুয়া শহরে ঘন ঘন মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিত যা সুলতানদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুলতান জালালুদ্দিনের পরবর্তী শাসকরা ধীরে ধীরে গৌড়কে নতুন করে সাজিয়ে তোলেন এবং পান্ডুয়া তার পুরনো জৌলুস হারাতে শুরু করে। মোগল আমলের পর পান্ডুয়া পুরোপুরি জনমানবহীন জঙ্গলে পরিণত হয় এবং এর রাজকীয় অট্টালিকাগুলো বটগাছের শিকড়ে ঢাকা পড়ে যায়। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা উনিশ শতকে এই জঙ্গল পরিষ্কার করে আদিনা ও একলাখির মতো স্থাপত্যগুলোকে বিশ্বের সামনে নতুন করে তুলে ধরেন।
বর্তমান পান্ডুয়া ও সংরক্ষণ প্রচেষ্টা
আজকের পান্ডুয়া মালদহ-শিলিগুড়ি জাতীয় সড়কের পাশে অবস্থিত এক শান্ত ও ধীরগতির জনপদ। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ASI) আদিনা মসজিদ ও একলাখি সমাধি সহ এখানকার প্রধান প্রত্নস্থলগুলোকে সংরক্ষণ করছে। শীতকালে মালদহ ভ্রমণে আসা পর্যটকরা আদিনার বিশাল প্রাঙ্গণে বসে ইতিহাসের ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এখানকার অনেক ছোট ছোট স্থাপত্য আজও অবহেলায় পড়ে আছে। পান্ডুয়া কেবল কতগুলো ইটের ধ্বংসাবশেষ নয় এটি বাঙালির স্বাধীন সুলতানি চেতনার এক ঐতিহাসিক দলিল। গৌড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পান্ডুয়াও প্রমাণ করে যে মধ্যযুগীয় বাংলা স্থাপত্য ও শক্তিতে দিল্লির চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। এখানকার লাল রঙের মাটি আর ধূসর পাথরগুলো আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই বাংলার মাটি থেকে একসময় দিল্লির তখত কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি জন্ম নিয়েছিল।










