
বাঙালির আল্পনা কেবল একটি নান্দনিক অঙ্কনশৈলী নয় বরং এটি হাজার বছরের পুরনো এক তাত্ত্বিক চর্চা যা জ্যামিতি, রসায়ন এবং আধ্যাত্মিকতার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। আমরা যখন কোনো উৎসব বা ব্রত উপলক্ষে ঘরের আঙিনায় সাদা পিটুলির ছোঁয়ায় সুন্দর নকশা দেখি তখন আমাদের মনে কেবল সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগে কিন্তু এর প্রতিটি রেখার পেছনে যে বিশাল বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো কাজ করে তা অধিকাংশ সময় আমাদের অজানাই থেকে যায়। আল্পনা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত আলিম্পন থেকে যার আক্ষরিক অর্থ হলো প্রলেপ দেওয়া। আদিম মানুষ যখন গুহাবাস থেকে কৃষিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় প্রবেশ করল তখন থেকেই তারা প্রকৃতির সাথে এক অদ্ভুত মরমী সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। তারা বিশ্বাস করত যে বিশেষ কিছু চিহ্ন বা নকশা ঘরের শ্রী বৃদ্ধি করে এবং অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে। এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই আল্পনার জন্ম। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে আল্পনার প্রতিটি উপাদান অত্যন্ত পরিকল্পিত। প্রাচীনকালে আল্পনা আঁকা হতো আতপ চালের গুঁড়ো জলে গুলে তৈরি করা পিটুলি দিয়ে। এখানে একটি চমকপ্রদ রসায়ন কাজ করে। চালের শ্বেতসার বা স্টার্চ যখন জলের সংস্পর্শে আসে তখন তা একটি আঠালো কোলয়েড দ্রবণ তৈরি করে যা মাটির মেঝে বা কাঠের পিঠে খুব সহজে আটকে যায়। শুকিয়ে যাওয়ার পর এটি একটি সাদা আস্তরণ তৈরি করে যা অনেকদিন স্থায়ী হয়। এটি আজকের আধুনিক প্লাস্টিক ইমালশন বা এক্রাইলিক রঙের চেয়েও পরিবেশবান্ধব। শুধু তাই নয় চালের গুঁড়োর ব্যবহার একটি বাস্তুসংস্থানগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ গ্রামবাংলার মানুষের বিশ্বাস ছিল জগতের প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাণীর সেবা করা মানুষের ধর্ম। আল্পনার এই চালের গুঁড়ো খেয়ে পিঁপড়া বা ছোট পতঙ্গরা তাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি করত যা ছিল এক ধরনের অহিংস সামাজিক দর্শন।
জ্যামিতিক দিক থেকে আল্পনা হলো এক অসাধারণ গাণিতিক বিন্যাস। একজন অভিজ্ঞ শিল্পী কোনো স্কেল কম্পাস বা জ্যামিতি বক্স ছাড়াই যখন হাতের আঙুলের সাহায্যে একটি নিখুঁত বৃত্ত বা সমান্তরাল রেখা আঁকেন তখন তিনি আসলে তার মস্তিষ্কে থাকা সহজাত জ্যামিতিক প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করেন। আল্পনার প্রতিটি নকশা সাধারণত একটি কেন্দ্রবিন্দু বা সেন্ট্রাল পয়েন্টকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়। একে জ্যামিতিক ভাষায় বলা হয় রেডিয়াল সিমেট্রি বা কেন্দ্রমুখী প্রতিসাম্য। মানুষের চোখ প্রাকৃতিকভাবেই প্রতিসাম্যপূর্ণ বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং এতে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পায়। আপনি যদি একটি সাধারণ পদ্ম আল্পনার দিকে তাকান তবে দেখবেন এর প্রতিটি পাপড়ি কেন্দ্র থেকে সমান দূরত্বে এবং সমান কোণে অবস্থিত। এই যে ভারসাম্য তা আসলে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার প্রতিফলন। ফ্র্যাক্টাল জিওমেট্রি বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পুনরাবৃত্তিমূলক জ্যামিতি যা আমরা বরফের কণা বা গাছের পাতার শিরদাঁড়ায় দেখি তার স্পষ্ট প্রয়োগ আল্পনার নকশায় লক্ষ্য করা যায়। একটি ছোট কলকা বা লতার নকশা যেভাবে বারবার ফিরে এসে একটি বিশাল বড় নকশা তৈরি করে তা গণিতের এক বিস্ময়কর উদাহরণ।
আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে আল্পনার মাহাত্ম্য অপরিসীম। বাংলার ব্রত কথা এবং আল্পনা একে অপরের পরিপূরক। প্রতিটি ব্রতের জন্য আলাদা আলাদা মোটিফ বা নকশা নির্ধারিত থাকে। যেমন লক্ষ্মীপূজার সময় লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকা হয় যা আসলে ধনাগম ও সমৃদ্ধির প্রতীক। কিন্তু এই পায়ের ছাপ আঁকার মধ্যেও একটি শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যেখানে মানবদেহের অ্যানাটমি বা শারীরিক গঠনের একটি বিমূর্ত রূপ প্রকাশ পায়। ধানের শিষের আল্পনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা একটি কৃষিপ্রধান জাতি এবং শস্যই আমাদের মূল সম্পদ। শঙ্খ বা মাছের আল্পনা উর্বরতা এবং মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। আল্পনার এই প্রতীকগুলো মূলত সেমিয়টিক্স বা চিহ্নবিজ্ঞানের অংশ। প্রতিটি চিহ্ন এখানে একটি গভীর বার্তা বহন করে যা মুখের কথা ছাড়াই মানুষের অন্তরে পৌঁছে যায়। আল্পনা আঁকার সময় যে একাগ্রতা ও মনঃসংযোগ প্রয়োজন তা এক ধরনের ধ্যানের মতো কাজ করে। গ্রামের মহিলারা যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকে মেঝেতে নকশা করেন তখন তাদের মস্তিষ্ক একটি আলফা তরঙ্গে অবস্থান করে যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এটি মূলত একটি থেরাপিউটিক প্রক্রিয়া যা শিল্পীকে তার দৈনন্দিন ক্লান্তি থেকে মুক্তি দেয়।
ঐতিহাসিকভাবে আল্পনার রূপান্তরও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার মৃৎপাত্রে যেসব জ্যামিতিক নকশা পাওয়া গেছে তার সাথে বাংলার আল্পনার নকশার এক অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। এর অর্থ হলো এই শিল্পকলা আমাদের রক্তে হাজার হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হচ্ছে। মধ্যযুগে যখন বৈষ্ণব ধর্ম ও সুফিবাদ বাংলায় প্রভাব বিস্তার করল তখন আল্পনার নকশাতেও অনেক পরিবর্তন এল। হিন্দু ঘরানার লতা-পাতা ও শঙ্খের সাথে মিশে গেল পারস্য স্থাপত্যের জ্যামিতিক কারুকাজ। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের শিল্পচর্চা আল্পনাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নন্দলাল বসুর মতো দিকপাল শিল্পীরা আল্পনাকে কেবল পূজা-পার্বণের অনুষঙ্গ থেকে বের করে এনে একটি স্বতন্ত্র ললিতকলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তারা শিখিয়েছেন কীভাবে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে সহজ সরল রেখায় ফুটিয়ে তোলা যায়। শান্তিনিকেতনি আল্পনায় আমরা দেখি এক ধরনের আভিজাত্য এবং পরিশীলিত রূপ যা আজকের দিনে সারা বিশ্বে নন্দিত।
বর্তমান যুগে আল্পনার ব্যবহার এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও আলোচনার দাবি রাখে। এক সময় যা কেবল পিটুলি ও খড়িমাটির ছিল আজ তা ফেব্রিক পেইন্ট, এক্রাইলিক এবং ডিজিটাল গ্রাফিক্সে রূপান্তরিত হয়েছে। রাজপথে যখন ২১শে ফেব্রুয়ারি বা নববর্ষ উপলক্ষে বিশাল আল্পনা আঁকা হয় তখন সেখানে কেবল আবেগ নয় বরং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও বৃহৎ স্কেল ড্রয়িংয়ের দক্ষতা প্রয়োজন হয়। কয়েকশ মানুষ মিলে যখন একটি কিলোমিটার দীর্ঘ আল্পনা তৈরি করেন তখন সেখানে টিমওয়ার্ক এবং জ্যামিতিক সিঙ্ক্রোনাইজেশন না থাকলে তা নিখুঁত হওয়া অসম্ভব। এটি আজ বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের একটি ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল্পনা এখন ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতেও জায়গা করে নিয়েছে। শাড়ি, পাঞ্জাবি বা ঘর সাজানোর সামগ্রীতে আল্পনার মোটিফ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে। তবে এই বাণিজ্যিকীকরণের ভিড়ে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে আল্পনার মূল প্রাণ নিহিত আছে তার সরলতায় এবং সেই আধ্যাত্মিক সংযোগে যা সাধারণ মানুষের মনের প্রার্থনাকে রঙের মাধ্যমে প্রকাশ করে।
শিল্প এবং বিজ্ঞানের এই যে মেলবন্ধন তা আল্পনার প্রতিটি রেখায় স্পষ্ট। বিজ্ঞান আমাদের বলে দেয় কীভাবে রঙের স্থায়িত্ব বাড়ানো যায় বা কীভাবে জ্যামিতিক ভারসাম্য রক্ষা করা যায় কিন্তু শিল্প আমাদের শেখায় সেই রেখার ভেতরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে। আল্পনা কেবল একটি গৃহসজ্জা নয় এটি বাঙালির দর্শনের প্রতিফলন। এটি শেখায় কীভাবে সীমিত সম্পদের মধ্যে থেকেও জগতকে সুন্দর করে তোলা যায়। এটি শেখায় প্রকৃতির ক্ষুদ্র প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা এবং মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার সাথে নিজের জীবনকে মিলিয়ে নেওয়া। তাই পরবর্তীবার যখন কোনো উৎসবের আঙিনায় একটি আল্পনা দেখবেন তখন কেবল তাকে একটি ছবি হিসেবে দেখবেন না বরং চিন্তা করবেন এর পেছনে থাকা কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং এক জাতির আত্মিক স্পন্দনের কথা। আল্পনা হলো সেই অদৃশ্য সমীকরণ যা মানুষের হৃদয়কে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গাণিতিক সৌন্দর্যের সাথে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে আমরা যেন আমাদের এই শিকড়কে ভুলে না যাই কারণ আল্পনার প্রতিটি সাদা রেখা আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষ্য দেয় এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ দেখায়। বাঙালির সৃজনশীলতার এই এক অনন্য স্বাক্ষর যা আজও অম্লান এবং ভবিষ্যতেও থাকবে এক চিরন্তন শিল্পকলা হিসেবে।



