কেরলে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে অতি সংক্রামক 'শিগেলোসিস': ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু, জেনে নিন এই রোগের লক্ষণ ও বাঁচার উপায়

কেরলে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে অতি সংক্রামক ‘শিগেলোসিস’: ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু, জেনে নিন এই রোগের লক্ষণ ও বাঁচার উপায়

কেরলে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে অতি সংক্রামক 'শিগেলোসিস': ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু, জেনে নিন এই রোগের লক্ষণ ও বাঁচার উপায় 2

করোনাভাইরাসের আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তুলছে। সাম্প্রতিককালে কেরলের কোঝিকোড় জেলা থেকে আসা একটি খবর স্বাস্থ্য দফতর এবং সাধারণ মানুষের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। খবর অনুযায়ী, সেখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ‘শিগেলোসিস’ (Shigellosis) নামক একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ।

ইতিমধ্যেই এই রোগে শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো, মাত্র ৩ বছর বয়সী একটি শিশু এই সংক্রমণের কারণে প্রাণ হারিয়েছে। শিশুদের এই মৃত্যু সংবাদ স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আজকের এই ব্লগে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব এই শিগেলোসিস রোগটি আসলে কী, কীভাবে এটি ছড়ায়, এর লক্ষণগুলি কী কী এবং কীভাবে আমরা নিজেদের ও পরিবারকে এই ভয়াবহ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারি।

শিগেলোসিস আসলে কী?

সহজ কথায়, শিগেলোসিস হলো একটি তীব্র অন্ত্রের সংক্রমণ বা ডায়েরিয়া রোগ। এটি ‘শিগেলা’ (Shigella) নামক এক ধরণের ব্যাকটেরিয়ার কারণে ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ব্যাসিলারি ডিসেন্ট্রি’ (Bacillary Dysentery) বা রক্ত আমাশয়ও বলা হয়।

এই ব্যাকটেরিয়াটি মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রে, বিশেষ করে বৃহদন্ত্রে আক্রমণ করে এবং সেখানে ক্ষত সৃষ্টি করে। এই রোগের সবচেয়ে ভয়ের দিক হলো এর উচ্চ সংক্রামক ক্ষমতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সুস্থ মানুষের দেহে রোগ সৃষ্টির জন্য এই ব্যাকটেরিয়ার অতি সামান্য পরিমাণ উপস্থিতিও (মাত্র ১০ থেকে ১০০টি ব্যাকটেরিয়া) যথেষ্ট।

কীভাবে ছড়ায় এই রোগ? (সংক্রমণের উপায়)

শিগেলোসিস মূলত ‘ফেক্যাল-ওরাল’ (Fecal-oral route) পথে ছড়ায়। অর্থাৎ, আক্রান্ত ব্যক্তির মলের মাধ্যমে নির্গত ব্যাকটেরিয়া কোনোভাবে সুস্থ মানুষের মুখে প্রবেশ করলে এই সংক্রমণ হয়। প্রধান কারণগুলি হলো:

১. দূষিত জল ও খাবার: এটি সংক্রমণের সবচেয়ে সাধারণ মাধ্যম। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে পানীয় জলের উৎসে শিগেলা ব্যাকটেরিয়া মিশে যেতে পারে। এছাড়া দূষিত জল দিয়ে ধোয়া কাঁচা ফলমূল বা সবজি খেলেও এই রোগ হতে পারে।

২. ব্যক্তিগত অপরিচ্ছন্নতা: আক্রান্ত ব্যক্তি যদি টয়লেট ব্যবহারের পর হাত সাবান দিয়ে ভালো করে না ধুয়ে থাকেন, তবে তার হাতে থাকা ব্যাকটেরিয়া খাবার, জলের পাত্র বা দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

৩. সংস্পর্শের মাধ্যমে: আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত তোয়ালে, বিছানা, জামাকাপড় বা বাসনপত্র স্পর্শ করলে এবং এরপর না ধোয়া হাত মুখে দিলে সুস্থ ব্যক্তিও সংক্রামক হতে পারেন।

৪. মাছি ও পতঙ্গ: মাছি অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তির মল থেকে ব্যাকটেরিয়া বহন করে খোলা খাবারের ওপর বসে, যা পরে সুস্থ মানুষ খেয়ে আক্রান্ত হয়।

শিগেলোসিসের প্রধান লক্ষণগুলি কী কী?

ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করার সাধারণত ১ থেকে ৪ দিনের মধ্যে (ইনকিউবেশন পিরিয়ড) লক্ষণগুলি দেখা দিতে শুরু করে। প্রধান উপসর্গগুলি হলো:

  • তীব্র পেটে ব্যথা ও মোচড়: নাভির চারপাশে বা তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণা।
  • রক্ত বা আমযুক্ত ডায়েরিয়া: মলের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে মিউকাস এবং রক্ত নির্গত হওয়া (এটি এই রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য)।
  • উচ্চ জ্বর: সংক্রমণের কারণে হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর আসতে পারে।
  • বমি বমি ভাব বা বমি: অনেক সময় ডায়েরিয়ার সাথে বমি হতে পারে।
  • বারবার পায়খানার বেগ: অনেক সময় মনে হয় পায়খানা হবে কিন্তু হয় না, বা সামান্য মল নির্গত হয় (Tenesmus)।
  • জলশূন্যতা (Dehydration): ঘন ঘন পাতলা পায়খানার কারণে শরীর থেকে প্রচুর জল ও খনিজ বেরিয়ে যায়। এর ফলে মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ক্লান্তি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।

কেন শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ বেশি বিপজ্জনক?

কেরলে ৩ বছরের শিশুটির মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিগেলোসিস শিশুদের জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে এবং তাদের শরীর খুব দ্রুত জলশূন্য হয়ে পড়ে।

শিশুদের ক্ষেত্রে যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না করা হয়, তবে নিম্নলিখিত জটিলতাগুলি দেখা দিতে পারে:

  • সেপসিস (Sepsis): ব্যাকটেরিয়া রক্তে মিশে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
  • হেমোলাইটিক ইউরেমিক সিনড্রোম (HUS): এটি কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে এবং রক্তস্বল্পতা তৈরি করতে পারে।
  • মৃগী বা খিঁচুনি: উচ্চ জ্বরের কারণে শিশুদের খিঁচুনি হতে পারে।

চিকিৎসা এবং করণীয়

শরীরে রক্তযুক্ত ডায়েরিয়া বা তীব্র পেটে ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে মুহূর্তের বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

১. ওআরএস ($ORS$): রোগীর শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জলের ঘাটতি মেটাতে দ্রুত ওআরএস বা নুন-চিনির জল, ডাবের জল খাওয়ানো শুরু করতে হবে।

২. অ্যান্টিবায়োটিক: যেহেতু এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত জরুরি। নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাওয়া একেবারেই অনুচিত।

৩. বিশ্রাম ও সুষম খাবার: রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রামে থাকতে হবে এবং সহজে হজমযোগ্য খাবার (যেমন- জাউ ভাত, চিঁড়ের জল, কলা) খাওয়াতে হবে।

প্রতিরোধের উপায়: কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন?

কেরলের এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এই ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো সচেতনতা এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা।

  • নিয়মিত হাত ধোয়া: খাবার তৈরি করার আগে, খাওয়ার আগে এবং অবশ্যই টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান ও জল দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ভালো করে হাত ধুতে হবে। শিশুদেরও এই অভ্যাস করাতে হবে।
  • বিশুদ্ধ পানীয় জল: সর্বদা জল ফুটিয়ে বা উন্নতমানের ফিল্টারের জল পান করুন। বাইরে যাতায়াতের সময় বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের বোতলজাত জল ব্যবহার করাই শ্রেয়।
  • খাবারের সতর্কতা: বাইরের খোলা খাবার, কাটা ফল বা বাসি খাবার একেবারেই এড়িয়ে চলুন। বাড়ির খাবারও সর্বদা ঢেকে রাখুন। কাঁচা ফল বা সবজি খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিন।
  • পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: আপনার বাড়ির পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা যেন ঠিক থাকে এবং আশেপাশের এলাকা যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে সেদিকে নজর দিন।
  • আক্রান্ত রোগীর যত্ন: বাড়িতে কেউ আক্রান্ত হলে তার ব্যবহারের জিনিস (তোয়ালে, বাসন) আলাদা রাখুন এবং সেগুলো নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করুন।

কেরলের কোঝিকোড়ের এই প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদের কতটা সতর্ক থাকতে হবে। শিগেলোসিস একটি গুরুতর রোগ হতে পারে, কিন্তু সঠিক স্বাস্থ্যবিধি এবং সচেতনতা পালনের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আসুন আমরা নিজেরা সচেতন হই, পরিবারকে সচেতন করি এবং এই সংক্রমণের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করি।

জনস্বার্থে প্রচারিত

Scroll to Top