ভারতে ডেঙ্গির প্রথম টিকার অপেক্ষা: কিউডেঙ্গা (Qdenga) থেকে ডেনজিঅল (DengiAll), প্রতিষেধকের দৌড়ে কে কোথায় দাঁড়িয়ে?

বর্ষা এলেই এ দেশের মানুষের মনে একটা পরিচিত আতঙ্ক ভিড় করে—’ডেঙ্গি’ (Dengue)। জল জমা, মশার বংশবৃদ্ধি আর তার সাথে হু হু করে বাড়তে থাকা প্লেটলেট কমে যাওয়ার ভয়। ভারতের মতো ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল দেশে ডেঙ্গি এখন আর কোনো মরসুমি রোগ নয়, এটি এক বিরাট বার্ষিক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং বহু প্রাণ ঝরে যায়।

করোনাভাইরাসের মতো মহামারীর বিরুদ্ধে আমরা সফলভাবে টিকা তৈরি ও প্রয়োগ করতে পারলেও, ডেঙ্গির মতো পুরোনো শত্রুর বিরুদ্ধে এখনও কোনো সার্বিক টিকা আমরা সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিতে পারিনি। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য দারুণ আশার খবর হলো, ভারত এখন ডেঙ্গির টিকা পাওয়ার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষেধক অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্বে রয়েছে এবং কিছু শক্তিশালী ভারতীয় প্রার্থীর ট্রায়ালও চলছে জোরকদমে।

আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা আলোচনা করব ভারতে ডেঙ্গির টিকার বর্তমান পরিস্থিতি, কোন কোন টিকা নিয়ে পরীক্ষা চলছে এবং কেন একটি কার্যকর ডেঙ্গি টিকা তৈরি করা চিকিৎসকদের কাছে এত বড় চ্যালেঞ্জ।

ভারতে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রধান টিকাগুলি

বর্তমানে ভারতে ডেঙ্গির টিকা নিয়ে যে কর্মযজ্ঞ চলছে, তাকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—একটি হলো বিদেশি টিকার ভারতে প্রবেশ এবং অন্যটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি টিকার ট্রায়াল। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. কিউডেঙ্গা (Qdenga) – জাপানের তৈরি প্রতিষেধক

জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা তাকেদা (Takeda)-র তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ টিকাটি বর্তমানে ভারতে ছাড়পত্র পাওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার। বিশ্বের বহু দেশে ইতিমধ্যেই এটি সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

  • বর্তমান স্ট্যাটাস: ভারতের কেন্দ্রীয় ড্রাগ নিয়ামক সংস্থা (CDSCO)-র একটি বিশেষ বিষয়জ্ঞ কমিটি (Subject Expert Committee) ইতিমধ্যেই ভারতে এই টিকাটি আমদানির পক্ষে ইতিবাচক সুপারিশ করেছে। ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অব ইন্ডিয়া (DCGI)-র চূড়ান্ত শিলমোহর পেলেই এটি ভারতের বাজারে চলে আসবে।
  • কাদের দেওয়া যাবে: অনুমোদন পেলে এটি ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের দেওয়া যাবে।
  • ডোজের সময়সীমা: ৩ মাসের ব্যবধানে এই টিকার মোট ২টি ডোজ নিতে হবে।
  • কার্যকারিতা: ডেঙ্গির প্রধান চারটি ভ্যারিয়েন্টের (Serotypes) বিরুদ্ধেই এটি দারুণ কার্যকর। সবচেয়ে বড় সুবিধে হলো, যারা আগে কোনোদিন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হননি, তারাও এই টিকা নিতে পারবেন (আগের কিছু টিকায় এই বাধ্যবাধকতা ছিল)।
  • ভারতে উৎপাদন: ভারতের বিশাল বাজারের চাহিদা মেটাতে তাকেদা হায়দরাবাদের বিখ্যাত ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা বায়োলজিক্যাল ই (Biological E)-র সাথে হাত মিলিয়েছে। ফলে ভারতের মাটিতেই এর বিপুল উৎপাদন হবে।
See also  থাইরয়েড সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থেকে মুক্তির প্রাকৃতিক উপায়: হাইপোথাইরয়েডিজম ও অলস মেটাবলিজম রোখার কার্যকর ঘরোয়া ও ভেষজ গাইড

২. ডেনজিঅল (DengiAll) – ভারতের নিজস্ব ভরসা

বিদেশি টিকার পাশাপাশি ভারত সরকার এবং ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেদের তৈরি টিকার ওপরেও জোর দিচ্ছেন। এই তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ‘ডেনজিঅল’।

  • প্রস্তুতকারক: এটি সম্পূর্ণ যৌথ প্রয়াস। দিল্লির প্যানাসিয়া বায়োটেক (Panacea Biotec) এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR) যৌথভাবে এটি তৈরি করছে।
  • বর্তমান স্ট্যাটাস: ভারতের প্রায় ১৯টি কেন্দ্রে ১০ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক স্বেচ্ছাসেবকের ওপর এই টিকার চূড়ান্ত অর্থাৎ তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল (Phase III Clinical Trial) চলছে। ট্রায়ালের প্রাথমিক রিপোর্ট অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক।
  • বিশেষত্ব: অধিকাংশ ডেঙ্গির টিকার ক্ষেত্রে দুটি বা তিনটি ডোজের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ‘ডেনজিঅল’ একটি সিঙ্গেল ডোজ (একক ডোজ) টিকা হতে চলেছে। অর্থাৎ মাত্র একটি ইঞ্জেকশন নিলেই কেল্লাফতে! এটি সফল হলে টিকাকরণ অভিযান অনেক সহজ হবে।

৩. সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (SII)

কোভিশিল্ড বানিয়ে বিশ্ব কাঁপানো পুণের ‘সেরাম ইনস্টিটিউট’-ও কিন্তু ডেঙ্গির টিকার দৌড়ে পিছিয়ে নেই।

  • বর্তমান পরিস্থিতি: তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (NIH) থেকে সংগৃহীত ভাইরাসের লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড (দুর্বল করা ভাইরাস) স্ট্রেন ব্যবহার করে ডেঙ্গির টিকা তৈরি করছে।
  • স্ট্যাটাস: বর্তমানে ভারতে শিশুদের ওপর এর প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল (Phase I/II) চলছে। শিশুদের সুরক্ষার জন্য এই টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

এক নজরে ডেঙ্গি প্রতিষেধক সমাচার (Comparison Table)

নিচের টেবিলটি থেকে আপনি খুব সহজেই বুঝে নিতে পারবেন কোন টিকার কী অবস্থা:

টিকার নামপ্রস্তুতকারক সংস্থাডোজ সংখ্যাবর্তমান পরিস্থিতিবিশেষ সুবিধা
কিউডেঙ্গা (Qdenga)তাকেদা (জাপান)২টি ডোজ (৩ মাস ব্যবধানে)সবুজ সংকেতের অপেক্ষায়যারা আগে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হননি, তারাও নিতে পারবেন।
ডেনজিঅল (DengiAll)প্যানাসিয়া বায়োটেক ও ICMR১টি ডোজ (একক)তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চলছেমাত্র ১টি ডোজেই দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার আশা।
SII ডেঙ্গি ভ্যাকসিনসেরাম ইনস্টিটিউট (ভারত)প্রথম/দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালশিশুদের শরীরে সুরক্ষার ওপর বিশেষ জোর।

কেন ডেঙ্গির টিকা তৈরি করা এত কঠিন? চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল ধাঁধা

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, করোনা ভাইরাসের টিকা যদি এক বছরের মধ্যে তৈরি হতে পারে, তবে ডেঙ্গির টিকা তৈরিতে এত বছর সময় লাগছে কেন? এর পেছনে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অত্যন্ত জটিল কিছু কারণ।

১. চারটি আলাদা ভ্যারিয়েন্ট (Serotypes):

ডেঙ্গি কোনো একক ভাইরাস নয়। এর ৪টি আলাদা রূপ আছে—DEN-1, DEN-2, DEN-3 এবং DEN-4। একটি কার্যকর টিকার কাজ হলো এই চারটি রূপের বিরুদ্ধেই সমানভাবে সুরক্ষা দেওয়া। যদি কোনো টিকা ৩টির বিরুদ্ধে কাজ করে আর ১টির বিরুদ্ধে না করে, তবে হিতে বিপরীত হতে পারে।

২. অ্যান্টিবডি-ডিপেনডেন্ট এনহান্সমেন্ট (ADE):

এটি ডেঙ্গি ভাইরাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক চরিত্র। সাধারণ নিয়মে একবার কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা দ্বিতীয়বার আক্রমণে শরীরকে রক্ষা করে। কিন্তু ডেঙ্গির ক্ষেত্রে উল্টো! যদি কেউ DEN-1 দিয়ে আক্রান্ত হন, তবে তার শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি DEN-2 বা DEN-3 ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ তো করেই না, উল্টো সেই ভাইরাসকে কোষের ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করে। এর ফলে দ্বিতীয়বার অন্য ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হলে রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করে (Dengue Hemorrhagic Fever)। বিজ্ঞানীদের এমন টিকা তৈরি করতে হচ্ছে যা এই ‘ADE’ সমস্যা তৈরি করবে না।

সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১. ডেঙ্গির টিকা কি ১০০% সুরক্ষা দেবে?

See also  বেলেডোনা ও তীব্র প্রদাহের সংকেত: আকস্মিক জ্বর ও রক্তসঞ্চালনের ভারসাম্য রক্ষায় এক অনন্য সমাধান

কোনো টিকাই ১০০% গ্যারান্টি দেয় না। তবে টিকা নিলে ডেঙ্গির কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৮০-৯০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

২. ভারতে কি সাধারণ মানুষ এখন ডেঙ্গির টিকা নিতে পারবেন?

না, এখনও ভারতের সাধারণ বাজারে ডেঙ্গির কোনো টিকা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির চূড়ান্ত ছাড়পত্র পায়নি। তবে কিউডেঙ্গা খুব দ্রুতই অনুমোদিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

৩. আগে ডেঙ্গি হয়ে থাকলে কি টিকা নেওয়া যাবে?

হ্যাঁ, কিউডেঙ্গার মতো আধুনিক টিকাগুলি আগে ডেঙ্গি সংক্রমণ হয়ে থাকলেও নেওয়া যাবে। তবে টিকা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

উপসংহার: টিকা আসার আগে পর্যন্ত আমাদের করণীয়

ডেঙ্গির টিকা হয়তো খুব শীঘ্রই আমাদের হাতের নাগালে চলে আসবে, কিন্তু তার আগে পর্যন্ত আমাদের চিরাচরিত লড়াই জারি রাখতে হবে। মনে রাখবেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সর্বদা শ্রেয়। বাড়ির চারপাশে জল জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার করা এবং পুরো হাতা জামাকাপড় পরাই ডেঙ্গি থেকে বাঁচার সবচেয়ে সেরা উপায়।

বিজ্ঞানীদের এই অভাবনীয় প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে আমরা আশা করতে পারি, খুব শীঘ্রই ভারত তথা গোটা পৃথিবী ডেঙ্গিমুক্ত হওয়ার পথে এক কদম এগিয়ে যাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top